লুনা রুশদীর কবিতা

0
115
Print Friendly, PDF & Email

আপনার হাসি, কী যে, কী…যে বলি!

মানে, কিন্নরা,
এই হাসি, আমি খুব ভালোবাসি,
এবং আপনাকেও..
প্রস্তাবেন মধ্যরাতে উদ্বেলিত ভবদীয় প্রেমিক প্রবর।

আমি আরো হাসি, কারণ আমার হাসি আসে।
ওই ভোরের বাতাসে,
যে মৌনিনী তরুণী, হেঁটেছিলো
হেঁটে হেঁটেছিলো শুধু, আর যায়নি কোথাও
তারে আর গেল না তো পাওয়া
যেন সে ছিলো না।
থাকলেও আমার সাথে তার ভাবসাব নাই।

প্রেমিক বলেন,
‘তুমি কেন কেবল কথাই…বলে যাচ্ছো না!
তোমার কথায় আমি ভাসি—
জগতের চাপরাশি, চাপে থাকি রাশি রাশি,
শুধু আপনার হাসি,
আহা জলতরঙ্গ! আমাকে তরল করে,
প্রবাহিত।
আর হাসবেন না প্লিজ! থামেন থামেন,
না না, অনেক হাসেন।’

আমি হাসি, আমি কথা বলে যাই।
যদি ভুলে যাই, খাটো বনসাই,
আমার ঘরের কোণে মৃত্যুশয্যায় দণ্ডায়মান।
কারণ শিকড়ে মাটি নাই,
আর,
যে আমারে কোনোদিন কাছে ডাকে নাই।

আমার আঠাশ আর জীবনানন্দ দাশ

জীবনানন্দ পড়ি, জীবন আনন্দে মরি।
আট আর কুড়ি যোগে ক্ষুদ্র আঠাশ,
তবুও স্বপ্নে স্মৃতি, পাহেলী নিশ্বাস।
জীবন আনন্দ রোগী, জীবনানন্দে ভুগি।

সেদিন বছর কুড়ি আগে, দাদী আমি পাশে পাশ, বেহুঁশ
উদাস। চিরল সাঁঝেলা আলো, না দেখা তরল মিশে,
ভেসে ভেসে ভেসে আসে মাগরিব আজান।
দাদী বসে ঘোলা চোখে, একদিন প্রতিদিন
ভিন দেশে চীন দেশী বাদামের ঝাঁকা কাঁখে ফেরিওয়ালা
হাঁকে ডাকে। বাইরে দেয়াল পাশে, গাছে,
টক টক, তক্ষক, থেকে থেকে
প্রথম দেখেছি আমি তাকে। আবার বছর কুড়ি আগে।

সময় সময় যোগে, যোগায় সময়।
দিন নয়, আয়ু ক্ষয় হয়।
ছবি থাকে, দিনও থাকে কোথাও কোথাও
মানুষের ছায়া থেকে মানুষ উধাও।

আমার জানালা খুলে সবুজ বাগান। উঠানের বেড়ে যাওয়া ঝিমঝিম
ঘাসে ছোট্ট শরীর নিয়ে নরম রোদের নিচে বেড়াল ঘুমায়।
তবু হায়, আট বছরের পরে, আসে কাছে, আট বছর আগের একদিন
সেই বোধ, যে আমারে ভালো চেনে, আমি যারে পারি না এড়াতে
সে আমার হাত ধরে হাঁটে। ছয়লাপ জট ধরে,
সব স্মৃতি, বিস্মৃতি, স্বপ্ন, বাস্তব। সব রঙ মুছে গেলে
পাণ্ডুলিপি ফিরে আসে ঘরে। পাখিরাও,
নদীদের ঘর নাই কোনো। বলি আমি ‘হে নাবিক কবে ফিরবেন?’
কুড়ি বছরের পরে ধানসিঁড়ি নদীতীরে একা বসে বনলতা সেন।

পথে পথে জীবনানন্দ

বহুদিন যার সাথে দেখা হয় নাই, তার সাথে আর দেখা হবে না কোথাও
এই সংবাদ খুব বেশি বিচলিত ব্যতিব্যস্ত করে না আমাকে, কারণ
তখনও আমি পথে। যার বুকে মাথা রাখি তারই কথা ভাবা বাকি
থেকে যায়। যেই পথে আমি চলি, যার সাথে, তার সাথে, সেই পথে
চলি নাতো আমি সর্বদাই। আর এই কথা কে না জানে, তড়পায় কতো
কতো বুক, মাথার বিহনে, নতুন উদিত যবে প্রশমিত হবে পুরাতন, এ
আচরণ প্রথাগত। তাই যে পথের বাঁকগুলি জেনে গেছি ভালোমতো,
আসি আসি হাসি নিয়ে ঠোঁটে, চলি সেই পথে। কে যেন কফির কাপে
দিয়েছিলো প্রথম চুমুক । আপ্লুত বলেছিলো, ‘যদি নাম ভুলে যাই, মনে রবে
আজীবন তোমার এ মুখ’। ভুলে গেছি, শুধু তার মনে রাখা মনে রয়ে
গেছে। বাতাসে ধুলার গন্ধে যে রকম মনে আসে ফেলে আসা সন্ধ্যার
খালি খালি লাগা। গাছেরা পাখিরা ডাকে, বাসযাত্রী ফিরে যায় ঘরে,
যাওয়া আসা ফেরা নাই, হাজার বছর ধরে পথ হাঁটি পৃথিবীর পরে।

মাঝরাতে

দুঃস্বপ্নের ঘোর লাগা চোখে, মাঝরাতে
গাছপালাগুলি অবাধ্য কালো হাত বাড়িয়ে দেয়
আধখোলা জানালা গলে অনায়াসে।
কাপড়ের ভাঁজ খুলে অন্ধকার নড়েচড়ে বসে।
বোতলের শূন্যতা বাজে বাতাসের দীর্ঘশ্বাসে।
গাড়ির হেডলাইট দূরের রাস্তায় তাড়া করে
কাকে যেন। চটুল গানের সুর, রেশ ফেলে যায়।
উঠানের গাছে পাখিরা ডানা ঝাপটায়, পাশ ফেরে।
শ্লথ পায়ে হেঁটে আসে কেউ; ঘরে ফেরা
হলো না এখনো। ভুলে থাকা না পাওয়ারা
জেগে উঠে আঁকিবুকি করে দেয়ালের গায়,
মিশে যায় ঘাসের শরীরে নিঃশব্দ শিশিরের মতো।

এমন সময়, উঠানের এক কোণে পড়ে থাকা
পায়াভাঙা বেচারা চেয়ারে,
নেমে আসে চাঁদের আলো, আসমানি স্পটলাইট।
আলো হাসে, আলো বসে, ঠিকরায় পিছলায়
ঝরে পড়ে ঘাসে। সেই অতিপ্রাকৃত সিংহাসনে
আরামে, শান্তিতে ঘুমায় লাওয়ারিশ কালো বেড়াল
চন্দ্রালোকের শাহজাদা।

শেয়ার করুন