মহাজোটের ঐক্য ক্রমেই শিথিল আর সংকুচিত হয়ে পড়ছে

0
94
Print Friendly, PDF & Email

ঢাকা (২০জানুয়ারী)  : বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট আটঘাট বেঁধে আন্দোলনে নামলেও সংগঠিত নয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট। ক্ষমতায় আসার পর গত চার বছরে মহাজোটের ঐক্য ক্রমেই শিথিল আর সংকুচিত হয়ে পড়েছে। মহাজোট থাকলেও বর্তমানে কার্যত তা আর সক্রিয় নয়।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রথমে বাম-গণতান্ত্রিক কয়েকটি দলের সমন্বয়ে ১৪ দল গঠিত হয়।পরে ১৪ দলের সঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিসহ আরো কয়েকটি দল নিয়ে বৃহৎ পরিসরে মহাজোট গঠিত হয়।

বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্যের মধ্য দিয়ে থেমে থেমে ১৪ দল চলতে থাকলেও বৃহৎ পরিসরে সম্প্রসারিত মহাজোট নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।

সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ছাড়া মহাজোটে আসা অন্য দলগুলো অনেক আগেই ছিটকে পড়ে এই জোট থেকে। ফলে কিছু দিনের মধ্যেই মহাজোট কার্যত নামমাত্র মহাজোটে পরিণত হয়।

আবার মহাজোটে থেকেও দীর্ঘ দিন তাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক হয় না।

পাশাপাশি মহাজোটে থেকে এবং সরকারের একটি মন্ত্রিত্ব নিয়েও জোট ও সরকার বিরোধী বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন এরশাদসহ জাতীয় পার্টির নেতারা। এরশাদ প্রতিনিয়তই ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছেন মহাজোট থেকে বেরিয়ে গিয়ে আগামীতে এককভাবে নির্বাচন করবে জাতীয় পার্টি।

সম্প্রতি এরশাদ বলেছেন, মহাজোটে থেকে জাতীয় পার্টি একটি মন্ত্রিত্ব ছাড়া আর কিছুই পায় নি।
   
এদিকে মৌলিক কিছু ইস্যুতেও এই জোটের মধ্যে রয়েছে মত পার্থক্য। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং জামায়াত-শিবিরসহ মৌলবাদ বিরোধী তৎপরতায় জাতীয় পার্টি সব সময়ই নীরব ভূমিকা পালন করে চলেছে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জামায়াত-শিবির বিরোধী আওয়ামী লীগের তৎপরতার সঙ্গে মহাজোটের শরিক হিসেবে কেন থাকছে না সে ব্যাপারে জাতীয় পার্টির কেউ প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে চান না।

যুদ্ধাপরাধী, জামায়াত-শিবির বিরোধী তৎপরতায় না যাওয়া তাদের রাজনৈতিক কৌশল বলে জাতীয় পার্টির এক নেতা মন্তব্য করেন।

এদিকে আওয়ামী লীগের এক নেতা এরশাদ মহাজোটে থেকে শুধু একজন মন্ত্রী পেয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু তিনি ব্যাংকের কথা ভুলে গেছেন, বেসরকারি ব্যাংক করারও অনুমতি পেয়েছেন এরশাদ।
 
বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের অত্যাচার, নির্যাতন, জঙ্গিবাদের উত্থানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ২০০৫ সালে প্রথমে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দল গঠন করা হয়।

এরপর জাতীয় পার্টিসহ আরো কয়েকটি দলের সমন্বয়ে ১৪ দলকে সম্প্রসারণ করে বৃহৎ পরিসরে মহাজোট গঠন করা হয়।

তবে মহাজোটের মধ্যে থাকলেও ১৪ দল আলাদা অবস্থান নিয়েও চলতে থাকে।

তাছাড়া ১৪ দলের অন্য শরিকরা শুরু থেকেই জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোট গঠনে সম্মত নেই, আবার মহাজোটেও আছে, এই অস্পষ্ট অবস্থান নিয়ে অগ্রসর হতে থাকে।
 
বর্তমানে ১৪ দলে রয়েছে আওয়ামী লীগ, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, ন্যাপ, গণতন্ত্রী পার্টি, সাম্যবাদী দল, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, গণআজাদী লীগ ও গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি।

সংগঠিত রূপে আত্মপ্রকাশের প্রক্রিয়ার পর্বেই ১৪ দল থেকে সরে যায় সিপিবি। ওয়ান ইলেভেনের পর থেকেই ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরামের সঙ্গে জোটের দূরত্ব বাড়তে থাকে। মহাজোট ক্ষমতায় আসার পরপরই জোট থেকে সরে পড়ে গণফোরাম।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের এক পর্যায়ে ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি, বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্প ধারা, কর্নেল অলির এলডিপি, জাকের পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশসহ কয়েকটি ইসলামী দলের সমন্বয়ে মহাজোট গঠিত হয়।

২০০৮ সালের নির্বাচন এবং সরকার গঠনের পর এই দলগুলো মহাজোট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একমাত্র জাতীয় পার্টিই এখন অবশিষ্ট আছে মহাজোটে। বলতে গেলে জাতীয় পার্টি মহাজোটের প্রতিনিধিত্ব করছে। জোট আছে, তবে দৃশ্যমান কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা নেই।

যুদ্ধাপরাধীদের দ্রুত বিচার দাবিতে থেমে থেমে কিছু নিয়ে কোনোরকম সক্রিয় আছে ১৪ দল। গত ৭ জানুয়ারি এই ইস্যুতে মানববন্ধন কর্মসূচি ছিলো। পরিবর্তন করে আগামী ২৪ জানুয়ারি নেওয়া হয়েছে।
 
এদিকে মহাজোটের নিষ্ক্রিয়তা সম্পর্কে জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমীন হাওলাদার বাংলানিউজকে বলেন, “মহাজোট আছে, তবে যৌথভাবে আরো সক্রিয় থেকে চলা উচিত ছিল। সেটা হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না সেটা আওয়ামী লীগ বড় দল তারাই বলতে পারবে।”

তিনি বলেন, “মহাজোট সরকার আছে। তবে আওয়ামী লীগ এককভাবেই মূলত সরকার চালাচ্ছে। গত বছর আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের একটি বৈঠক হয়েছিল। এরপর আর কোনো বৈঠক হয়নি। সরকারের ব্যর্থতা সফলতা আছে। কিস্তু জোট হিসেবে তো যৌথভাবে চলা উচিত। যে প্রেক্ষাপটে মহাজোট গঠন হয়েছিলো সে প্রেক্ষাপট এখনো বিদ্যমান। আমি মনে করি, বিষয়টি নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগও উপলব্ধি করে।”

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলু বলেন, “মহাজোটের নেতৃত্বে আছে আওয়ামী লীগ। তারাই বলতে পারবে মহাজোট কেন সক্রিয় না। গত ২০১১ সালের ডিসেম্বরে সর্বশেষ বৈঠক হয়। এরপর আর কোনো বৈঠক হয়নি। তবে আমাদের পার্টির চেয়ারম্যানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দু’একবার কথা হয়েছে।”

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী বলেন, “জাতীয় পার্টির নেতাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের কথা হয়।”

তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ বড় দল, তাই আওয়ামী লীগের উপর তো মান অভিমান থাকতেই পারে।”কিন্তু এরশাদ সংসদে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়েছেন বলেও স্মরণ করিয়ে দেন মতিয়া।

নিউজরুম

শেয়ার করুন