দেশে জ্বালানি গ্যাসের তীব্র সঙ্কট অবিলম্বে এ দুর্ভোগের অবসান প্রয়োজন

0
158
Print Friendly, PDF & Email

১৪ জানুয়ারি, ২০১৩।।

রাজধানীসহ সারা দেশে জ্বালানি গ্যাসের সঙ্কট চলছে। গত কয়েক দিনে তা হয়ে উঠেছে তীব্রতর। ঢাকা মহানগরীর বহু এলাকায় এমনকি ভোর থেকে গভীর রাত নাগাদ গ্যাস থাকছে না। ফলে রান্নাবান্না করা দূরের কথা, প্রচণ্ড শীতের মাঝে পানি গরম পর্যন্ত করা যাচ্ছে না। মধ্য ও শেষ রাতে রান্না করতে হচ্ছে গৃহিণীদের। এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকেই। গ্যাসের অভাবে জীবনযাত্রা ও শিল্প উৎপাদন এখন ব্যাপক বিপর্যয়ের শিকার।

রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলো ছাড়াও মাঝারি ও ছোট অনেক পৌর এলাকাও জ্বালানি গ্যাসের নেটওয়ার্কের আওতায়। ফলে গ্যাসসঙ্কটে দেশের লাখ লাখ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় দুর্ভোগ নেমে এসেছে। শীত যত বাড়ছে ততই বাড়ছে এই সমস্যা। রাজধানীতে দেখা যায়, প্রতিদিনই দীর্ঘ সময় গ্যাস থাকে না; আর থাকলেও চাপ কম। এতে রান্না ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজে খুবই অসুবিধা হচ্ছে। বিদ্যুৎ লোডশেডিংয়ের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ ধরে নিতে পারে, কতক্ষণ বিদ্যুৎ থাকবে না। গ্যাসের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয় না। শীতকালে তাপমাত্রা অনেক নেমে যায় বলে গৃহস্থালী কাজে বেড়ে যায় জ্বালানি তথা গ্যাসের চাহিদা। অথচ এই সময়েই গ্যাসের ঘাটতি বাড়তে দেখা যায়। এখন ঢাকার অনেকেই কেরোসিনের স্টোভ ব্যবহার করছেন বিকল্প হিসেবে। নারায়ণগঞ্জে লাকড়ি দিয়ে রান্নার মাটির চুলা বিক্রির হিড়িকের খবর পত্রিকায় উঠেছে। এ দিকে গ্যাসের অভাবে রান্না অসমাপ্ত থাকা এবং মেহমান নিয়ে বিড়ম্বনার ঘটনাও ঘটছে। অনেকে হোটেলের খাবার খেতে বাধ্য হচ্ছেন বলে খরচও বেড়ে যাচ্ছে। বহু পরিবারে শেষ রাতে উঠে দিনের খাবার এবং সন্ধ্যার অনেক পরে রাতের খাবার রান্না করতে হচ্ছে যথাসময়ে গ্যাস থাকে না বলে।

গ্যাসের অভাবে মানুষের কষ্ট কোনপর্যায়ে পৌঁছেছে, তার নজির তুলে ধরে একটি সহযোগী দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ঢাকার বনশ্রী আবাসিক এলাকার একজন গৃহবধূ জানিয়েছেন, গত বুধবার ভোর ৬টায় গ্যাস চলে গিয়ে ফিরে এসেছে প্রায় ১৮ ঘণ্টা পরে, অর্থাৎ মধ্যরাতে। শুধু ওই দিনই নয়, ১৫ দিন ধরে এমন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নগরীর দক্ষিণ অংশে গেন্ডারিয়ার এক গৃহিণী জানান, ‘রাত ৩টায় ঘুম থেকে উঠে রান্না শুরু করতে হয়েছে। মাত্র ২ ঘণ্টা না যেতেই গ্যাস চলে গেল, তখনো রান্নাই শেষ হয়নি।’ নগর উপকণ্ঠে ডেমরার একজন মহিলা বলেন, গ্যাস দিনে থাকে না বলে রাত জেগে রান্না করতে হচ্ছে। আর দিনে নানা কাজের ব্যস্ততা আছেই। ফলে অসুস্থ হয়ে পড়েছি।’ কিন্তু যেসব মহিলা চাকরি করেন, তারা কী করবেন? গোলাপবাগের বাসিন্দা এক মহিলা জানান, ‘চাকরি করি। তাই রান্না সম্ভব নয় রাতজেগে। শুকনা খাবার কিংবা হোটেলের খাবারই ভরসা।’ জানা গেছে, গ্যাসসঙ্কটে বাসাবাড়িতে রান্না লাটে ওঠায় হোটেল-রেস্তরাঁর ওপর চাপ পড়ছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেখানেও খাবার ফুরিয়ে যায়। ফলে বাসি খেয়ে পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

নয়া দিগন্ত জানায়, কেরোসিনের চুলার চাহিদা বাড়ার এই সময়েই সরকার জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেয়ায় কেরোসিন লিটারপ্রতি বেড়েছে ৭ টাকা। বেড়েছে চুলার দামও। সীমিত আয়ের অসংখ্য মানুষের জন্য এসব কিছু ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। গ্যাসের চাপ কম সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। ফলে যানবাহনকে একাধারে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হয় একবার গ্যাস নিতেই। দিনের বেশির ভাগ সময়ে স্টেশনে গ্যাস থাকে না; থাকলেও চাপ থাকে কম। এ দিকে সুযোগ বুঝে এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়ে দ্বিগুণেরও বেশি করা হয়েছে।

বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জাতীয় সংগঠনের প্রধান, আবদুস সালাম মুর্শেদী সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, দেশের বেশির ভাগ কলকারখানাই চলে গ্যাস দিয়ে। এই সরকার সাড়ে তিন বছর যাবৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নতুন করে গ্যাস সংযোগ দিচ্ছে না। তদুপরি, যেগুলোতে আগে থেকেই সংযোগ আছে, সেগুলোও এখন দিনের বেলায় গ্যাস পাচ্ছে অপর্যাপ্ত। এতে উৎপাদনে মারাত্মক বিঘœ ঘটছে।’ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনও একই অভিযোগ করেছে। এর সভাপতি জাহাঙ্গীর আলামিন বলেছেন, আমাদের শিল্প উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে গ্যাসের অভাবে।

গ্যাসসঙ্কটের কারণ দূর করার দায়িত্ব সরকারের। অথচ খোদ সরকারের দু’টি সংশ্লিষ্ট সংস্থা এ ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন কথা বলে বিভ্রান্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজধানী ও আশপাশের অঞ্চলে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত তিতাস গ্যাস কোম্পানির বক্তব্য, শীতের বর্ধিত চাহিদামাফিক গ্যাস মিলছে না। অন্য দিকে পেট্রোবাংলার কথা হলোÑ গ্যাস উৎপাদন নয়, ‘কারিগরি’ কারণে চলমান সঙ্কট দেখা দিয়েছে। তিতাসকে গ্যাস সরবরাহ করে থাকে পেট্রোবাংলা। এখন এর চাহিদা ১৬৫ কোটি ঘনফুট। ঘাটতি ২৫ কোটি ঘনফুট। পেট্রোবাংলা তিতাসকে দোষারোপ করে বলেছে, তাদের পাইপলাইন পুরনো এবং অপেক্ষাকৃত সঙ্কীর্ণ। আর এই মওসুমে গ্যাসের চাপ থাকে কম। পেট্রোবাংলার উৎপাদনক্ষমতা ২৩০ কোটি ঘনফুট। তবে এখন উৎপাদনের পরিমাণ এর চেয়ে চার কোটি ঘনফুট কম। এর কারণ ‘চাহিদা কম থাকা’ বলে পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন সূত্র জানায়। শীতকালে যে গ্যাসের চাহিদা বেশি, তা অনস্বীকার্য। তবুও কেন এই সময়ে চাহিদা ‘কম থাকা’র কথা বলা হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়।

আমরা মনে করি, প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো অপরিহার্য জ্বালানির সঙ্কট দূর করার যথাসাধ্য উদ্যোগ নিতে হবে আর দেরি না করে। অন্যথায় বিশেষ করে নি¤œ ও মধ্যবিত্ত মানুষের ভোগান্তি সীমা ছাড়িয়ে যাবে। তাদের অতিরিক্ত ব্যয়সহ নানাভাবে বিষম অসুবিধায় পড়তে হবে। গ্যাস উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহÑ প্রতিটি পর্যায়ের সব ত্রুটি ও সমস্যা শীত আসার আগেই দূর করার পদক্ষেপ নেয়া উচিত। না হয়, প্রতি বছরই শীতের ক’মাস গ্যাসসঙ্কটে মানুষের কষ্ট উঠবে চরমে।

   
শেয়ার করুন