জনপ্রশাসন রাজনীতির অশুভ ছায়া মুক্ত হওয়া জরুরি

0
137
Print Friendly, PDF & Email

১২ জানুয়ারি, ২০১৩।।

আমাদের জনপ্রশাসন বৈশিষ্ট্য হারাতে বসেছে। দলীয়করণের কারণে জনপ্রশাসনের যে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার একটি স্বতন্ত্র চরিত্র গড়ে উঠেছিল সেটাও আর অবশিষ্ট নেই। ‘আমলা’ শব্দটিও এখন নেতিবাচক চরিত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়। এরও আসল কারণ রাজনীতিকায়ন। আওয়ামী লীগ গেলবার ক্ষমতায় আসার সিঁড়ি হিসেবে জনতার মঞ্চ তৈরি করেছিল। আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একদল আমলা তাতে যোগ দিয়ে জনপ্রশাসনকে রাজনীতির লেজুড়বৃত্তির সাথে জড়িয়ে দিয়েছিলেন। তারই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় জনপ্রশাসন আজ প্রশ্নবিদ্ধ। তা ছাড়া জনপ্রশাসনে জমেছে সমস্যার পাহাড়। বিভিন্ন সময় এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে শুধু আশ্বাস পেয়ে আসছেন বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। সেসব আশ্বাস পূরণের কোনো খবর নেই, উপরন্তু সমস্যা সমাধানে খোদ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশও কার্যকর হচ্ছে না। এসব সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ২৬ ক্যাডার সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস সমন্বয় কমিটি হতাশ হয়ে পড়েছে। এ সমস্যাগুলো সমাধানে কমিটির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টার কাছে চিঠিও দেয়া হয়েছে। ক্যাডার সার্ভিস সংশ্লিষ্টরা মনে করেন,  সচিবালয়ে পুলপদে সব ক্যাডারের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তা ছাড়া প্রতিভাবান মেধাবী কর্মকর্তাদের কর্মের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে পঞ্চম গ্রেড থেকে তদূর্ধ্বের পদগুলোতে পিএসসির মাধ্যমে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় নিয়োগ বা পদায়নের দাবি রয়েছে। সমন্বয় কমিটি এসব দাবি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের পর বিভিন্ন সমস্যা সমাধানকল্পে জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টাকে আহ্বায়ক করে ১৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির বৈঠকে সব ক্যাডারের পুনর্গঠন প্রস্তাব, বিভিন্ন অধিদফতর ও সংস্থা প্রধানের পদ গ্রেড ১-এ উন্নীত করা ও চতুর্থ গ্রেডে সিলেকশন গ্রেড প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়; অথচ আজ পর্যন্ত এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কোনো অগ্রগতিও পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী প্রশাসনে এখনো ২০০২ সালের প্রণীত বিধিমালা অনুযায়ী পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। নতুন বিধিমালার খসড়া তৈরি হলেও তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। এ বিধিমালা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত থাকলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা বেড়েছে। কর্মকর্তারা মনে করেন,  প্রচলিত এ বিধিমালার বারবার অপব্যবহার হচ্ছে। অন্য দিকে প্রচলিত আইনে মঞ্জুরিকৃত পদের বিপরীতে পদোন্নতি প্রদানের স্পষ্ট বিধান থাকলেও তা মানা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এতে জনপ্রশাসনের শৃঙ্খলা দিনে দিনে একেবারে ভেঙে পড়ছে। এখন এর স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিধিবহির্ভূতভাবে বর্তমান সরকারের আমলে বেশ কয়েকটি পদোন্নতির ফলে সরকারের ব্যয় বেড়ে গেছে। আগের পদে বহাল রাখায় উপসচিবের কাজ করে একজন কর্মকর্তাকে যুগ্ম সচিব এবং যুগ্ম সচিবের কাজ করে একজন কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত সচিবের বেতনভাতা ও সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে। এতে শুধু শৃঙ্খলাই ভঙ্গ হচ্ছে না, রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে।

পরীার মাধ্যমে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয়ার বিষয়ে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলেও এটাও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর জনপ্রশাসনে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিলÑ পরীার মাধ্যমে যিনি পদোন্নতির যোগ্য হবেন, শুধু তিনিই পদোন্নতি পাবেন। পদোন্নতি পেতে হলে লিখিত পরীায় উত্তীর্ণ হতে হবে। এ জন্য আলাদা একটি বোর্ড গঠন করারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। এ বোর্ড জনপ্রশাসনে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি পরীার ব্যবস্থা করবে। তাতে পদ শূন্য না থাকলেও পদোন্নতি দেয়া হবে। এর ফলে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকার পর পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। এ অবস্থান থেকেও সরকার সরে এসেছে। ইতঃপূর্বে সিভিল সার্ভিস আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হলেও তার কোনো অগ্রগতি নেই।

জনপ্রশাসনিক ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে ১৯৯৭ সালের জানুয়ারিতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিগত মেয়াদে ১৪ সদস্যের একটি জনপ্রশাসন সংস্কার কমিটি গঠন করেছিলেন। সেই কমিটি ২০০০ সালের ২৫ জুন ‘একুশ শতকের জনপ্রশাসন’ নামে পাঁচ খণ্ডের একটি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেছিল; কিন্তু আজ পর্যন্ত ওই প্রতিবেদনও আলোর মুখ দেখেনি। বাংলাদেশের জনপ্রশাসন ঢেলে সাজানোর কোনো উদ্যোগও লক্ষ করা যায়নি। বরং ওএসডিকরণ, রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতি ও পদায়নের হিড়িক পড়েছে, যার ফলে প্রশাসন কার্যত স্থবির ও অনেক ক্ষেত্রে অযোগ্যতার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে আছে।

আমরা মনে করি, এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে জনপ্রশাসনকে রাজনীতিকায়নের অশুভ ছায়া থেকে মুক্ত করা জরুরি। তা হলে যোগ্যতাই প্রাধান্য পাবে। সংস্কার পক্রিয়াও চালু করা সম্ভব হবে। আশা করি, দলীয় প্রভাবের বাইরে নিয়ে পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেয়া হবে। নয়তো প্রশাসন গতিহীন অবস্থা থেকে একপর্যায়ে মুখথুবড়ে পড়বে, যা কারো কাম্য হতে পারে না।

শেয়ার করুন