নির্মল সেনের মৃত্যু এক বর্ণাঢ্য কলমযোদ্ধা হারাল জাতি

0
74
Print Friendly, PDF & Email

১০ জানুয়ারি, ২০১৩।।

খ্যাতিমান সাংবাদিক ও রাজনীতিক নির্মল সেন ৮২ বছর বয়সে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে মারা যান। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলে গত ২৩ ডিসেম্বর নির্মল সেনকে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর আগে ২০০৩ সালের ১১ অক্টোবর নির্মল সেন ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এরপর দেশে-বিদেশে চিকিৎসার পর তিনি তার গোপালগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। গত বছরের শেষে অবস্থার অবনতি হলে আবার তাকে রাজধানীর ল্যাবএইডে ভর্তি করা হয়। আজ বৃহস্পতিবার সর্বস্তরের মানুষের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানোর পর তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।

নির্মল সেন ১৯৩০ সালের ৩ আগস্ট গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার দীঘিরপাড় গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯৪২ সাল থেকে স্কুলে পড়ার সময়। ১৯৫২ সালে তিনি জেলে যান। ১৯৬৯ সালে আদমজী জুট মিলে শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠনে নেতৃত্ব দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সভাপতি। রাজনৈতিক কারণে তিনি বারবার কারান্তরীণ  হয়েছেন। কারাগারে থেকে তিনি নানা দাবিতে অনশন করেছেন। সাধারণ কয়েদিদের অধিকার রক্ষার এ অনশন তার আত্মত্যাগের অনন্য উদাহরণ।  অবিভক্ত সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা ছিলেন শ্রী নির্মল কুমার সেন। সাংবাদিকতায় থেকে তিনি সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকদের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। তার আপসহীন মনোভাব ও অনন্য লেখনীশক্তি স্বৈরশাসকের সিংহাসনকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। এ জন্য তিনি হয়েছিলেন জনপ্রিয়। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় কমরেড পত্রিকায় লিখে তিনি শুরু করেছিলেন কলমযুদ্ধ। ১৯৬১ সালে ইত্তেফাক পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু করেন পুরোদমে। এরপর প্রধান সারির দৈনিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সাংবাদিকতা করেছেন। ১৯৭২-৭৩ সালে নির্মল সেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি এবং ১৯৭৩-৭৮ পর্যন্ত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। তিনি জাতীয় প্রেস কাবের আজীবন সদস্য।

রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও শোষণের বিরুদ্ধে কলম ধরে তিনি জাতির আস্থা ও সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৭৩ সালে অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলায় ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’ শিরোনামে যে সাহসী উচ্চারণ তিনি করেছিলেন, তার জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, গুম, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, বিনাবিচারে হত্যা, রাহাজানি লুটপাটের বিরুদ্ধে জাতি যখন অসহায় ছিল তখন এ ধরনের একটি সাহসী উচ্চারণের বড় প্রয়োজন ছিল। একই ধরনের অবস্থা আজ যেন আবার জাতির ঘাড়ে চেপে বসতে চলেছে। ঠিক এই সময়ে তার তিরোধান  কোনোভাবে পূরণ হওয়ার নয়।

 

নির্মল সেনের মৃত্যু প্রকৃতপক্ষে একজন বড়মাপের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতার মৃত্যু।  গণমাধ্যমকর্মী ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তার মৃত্যুতে একই সাথে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, সাংবাদিক নেতাসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। এই সাংবাদিক রাজনৈতিক নেতার মৃত্যুতে আমরা শোকাভিভূত।

শেয়ার করুন