দুর্বৃত্তের হাতে র‌্যাব-পুলিশের সরঞ্জাম প্রতিকার বিধান জরুরি

0
83
Print Friendly, PDF & Email

১০ জানুয়ারি, ২০১৩।।

দেশের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের, বিশেষ করে বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের তো বটেই, এমনকি নাগরিক সাধারণও আজ চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। অস্বীকার করার উপায় নেই, এই নিরাপত্তাহীনতার জন্য সরকারের দমন-পীড়ন নীতি সূত্রে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যখন তখন আটক ও নির্যাতন কম দায়ী নয়। তবে এর বাইরে দুর্বৃত্তরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ভাঙিয়ে যাকে তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, গুম করছে কিংবা খুন করছে। এসব খুনের ঘটনা ঘটছে রাজনৈতিক কারণে ও ব্যক্তিগত বিরোধের সূত্র ধরে। আর এরা এই কাজটি সহজেই করতে পারছে, কারণ এখন দুর্বৃত্তের হাতে চলে গেছে র‌্যাব-পুলিশের পোশাক ও সরঞ্জাম। দুর্বৃত্তরা এসব পোশাক ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে অনেকটা নিরাপদে তাদের অপরাধকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে জনমনে আশঙ্কার মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। বিভিন্ন ঘটনার ধারা-প্রকৃতি দেখে আন্দাজ-অনুমান করতে অসুবিধা হচ্ছে না, ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনোটি ঘটছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কারণে আর কোনোটি ঘটছে এর বাইরে বিভিন্ন অপরাধী চক্রের মাধ্যমে। তবে ঘটনার পেছনে যাদের সংশ্লিষ্টতাই থাকুক, এর অবসান কামনা করছে দেশের সচেতন মানুষ।

নয়া দিগন্ত গতকাল এক খবরে জানিয়েছে, বাজারে অবাধে বিক্রি হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক, ব্যাজ, হ্যান্ডকাফ, ওয়াকিটকিসহ নানা সরঞ্জাম। যদিও নিয়ম হচ্ছে, আইডি কার্ড দেখিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তা কিনতে পারবেন। বিভিন্ন বাহিনীর আইডি কার্ড পাওয়া যাচ্ছে নীলক্ষেতের মতো বাজার-হাটে। অপরাধীরা এসব ব্যবহার করে নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে ছিনতাই, ডাকাতি, গুম, খুনসহ নানা অপরাধ করে যাচ্ছে; আর সময়ের সাথে এই প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। এর সর্বশেষ শিকার রাজধানীর ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সদস্যসচিব ও বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ী নেতা রফিকুল ইসলাম মজুমদার। রাজনৈতিকভাবে নেতৃত্বে চলে আসা, কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে কর্মকাণ্ড শুরু এবং রাজধানীর বঙ্গবাজার, মহানগর শপিং কমপ্লেক্স, গুলিস্তান আদর্শ মার্কেট ও এনেক্স মার্কেট নিয়ে গঠিত বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে নেতৃত্বে আসা এই ব্যক্তির জনপ্রিয় হয়ে ওঠাই নাকি তার জন্য কাল হয়ে ওঠে। এর আগে এই ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম গুম হন। তার গুমের ঘটনার আজো কোনো রহস্য উদঘাটিত হয়নি। চৌধুরী আলম নিখোঁজ হওয়ার পর রফিকুল ইসলাম ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদের নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার বাগুলাট ইউনিয়নের আদাবাড়িয়া এলাকা থেকে গত শনিবার রাতে ‘পুলিশ’ লেখা হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় একটি পেঁয়াজক্ষেত থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। তার স্ত্রীর অভিযোগ, ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার আনন্দনগর গ্রামে রফিকুল ইসলামের শ্বশুরবাড়ি। রফিকুল ইসলাম সেখানে বেড়াতে গেলে শনিবার সন্ধ্যায় র‌্যাব পরিচয়ে কয়েকজন তাকে ধরে নিয়ে যায়। গভীর রাতে টিভি নিউজের মাধ্যমে স্ত্রী জানতে পারেন, পুলিশ তার স্বামীর লাশ উদ্ধার করেছে হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায়। তিনি দাবি করেন, র‌্যাবই তাকে গ্রেফতার ও পরে হত্যা করেছে। র‌্যাব অবশ্য তা অস্বীকার করেছে। তাদের ধারণা, সন্ত্রাসীরা বাজার থেকে ‘পুলিশ’ লেখা হাতকড়া কিনে তা ব্যবহার করেছে। এ ঘটনার জন্য দায়ী অপরাধীরা। তার মৃত্যুতে উত্তপ্ত বঙ্গবাজার ও গুলিস্তান এলাকার ব্যবসায়ীরা বিুব্ধ। বিুব্ধ তার দল বিএনপি। তাদের অভিযোগ, সরকারের ষড়যন্ত্রের শিকার রফিকুল ইসলাম। সরকার একের পর এক রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা ও গুম করে চলেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবহার করে, এ হত্যাকাণ্ড তারই অংশ।

সরকার, র‌্যাব, পুলিশ এর সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে চলেছে। যদি তা-ই হয়, তবে সরকারকে তা প্রমাণ করতে হবে সত্যিকারের অপরাধীদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করে। সেই সাথে র‌্যাব-পুলিশের পরিচয়ে বিভিন্নজনকে ধরে এনে অপরাধীরা যেভাবে খুন-গুম করছে তা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারকেই। একই সাথে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে কেউ বাজার থেকে কিংবা অন্য কোনো উৎস থেকে অবাধে র‌্যাব-পুলিশের পোশাক ও সাজসরঞ্জাম কেনার সুযোগ না পায়। সুযোগ না পায় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করার। সরকার ও সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শুধু অভিযোগ অস্বীকার করলেই চলবে না, সর্বোপরি মানুষের নিরাপত্তা বিধানের বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্বও তাদের ওপরই শত ভাগ বর্তায়। এ দায় অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই।

     
শেয়ার করুন