বিচার হবে তো? সাজিয়ার বাবা মা

0
52
Print Friendly, PDF & Email

(৯ জানুয়ারী):ধর্ষণের হাত থেকে রক্ষা পেলেও নিজের জীবন রক্ষা করতে পারেননি চিকিসক সাজিয়া আফরিনঅপরাধী ধরা পড়েছেবিচার হবে তো?

কী ভেবেছিল মেয়েটা মারা যাওয়ার আগমুহূর্তে? মাকে কি ডেকেছিল? নিশ্চয় অনেক ভয় পেয়েছিলএমন অনেক কথা এখন সাজিয়ার মায়ের মনে ঘুরপাক খাচ্ছেগত ৩০ নভেম্বর ঢাকার দক্ষিণখানের ব্র্যাক ক্লিনিকে ওই ক্লিনিকের ওয়ার্ডবয় ফয়সাল সাজিয়া আফরিনকে খুন করেননিজের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে তাঁকে
সাজিয়া ও নাদিয়া দুই বোনমনিরুল ইসলামের দুই পায়রাহায়েনার ছোবলে একটি পায়রা মারা গেলশূন্য খাঁচার মতো ঢাকার কাওলার সাজিয়াদের বাড়িজুড়ে সুনসান নীরবতাএই ভাড়া বাড়িটিতে তাঁরা উঠেছেন গত বছরের সেপ্টেম্বরেমেধাবী চিকিসক মেয়ের একটা নিজের ঘর লাগেতাই একটু বড় দেখে এই বাড়িভাড়া নেনআজ সব আছে, শুধু মেয়েটি নেইসিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে গাইনিতে এফসিপিএস প্রথম পর্ব শেষ করেনপাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে সাম্মানিক (অনারারি) প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেনঢাকার দক্ষিণখানের ব্র্যাক ক্লিনিকে তাঁর কাজের বয়সসীমা মাত্র নয় দিনচাকরি করলে পড়াশোনায় অসুবিধা হয়তাই মা-বাবাকেও বলেছিলেন কাজটা ছেড়ে দেবেন২৯ নভেম্বর সকালে মাকে বলেন, আজই এখানে শেষ কাজতখন কি জানতেন চাকরির শেষ দিন মেয়ের জীবনের শেষ দিন হয়ে যাবে? তাহলে কি সাজিয়া আগে থেকে বুঝতে পেরেছিলেন? কেউ কি বিরক্ত করত তাঁকে? মা-বাবা দুজনই একসঙ্গে নাবললেনসাজিয়ার বাবা মনিরুল বলেন, ‘কেউ বিরক্ত করলে আমাকে না বললেও ওর মা বা ছোট বোনকে বলত
সেদিন দুপুরে খাওয়ার পর ছোট বোনের সঙ্গে কেনাকাটা করতে যানসন্ধ্যায় নামাজ পড়ে মাকে বলেন, এখনই বের হতে হবে, নাইট ডিউটি আছেমা দৌড়ে যান রান্নাঘরে ভাত রান্না করতেগিয়ে দেখেন গ্যাস নেইতখন ছোট বোন কমলার খোসা ছাড়িয়ে বোনকে খেতে দেয়মা-বাবা বলেন, যাওয়ার সময় হোটেল থেকে রাতের খাবার যেন কিনে নিয়ে যানমাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে বের হয়ে যান সাজিয়ারাত নয়টার দিকে মনিরুল ইসলাম ফোন করেন মেয়ে খাবার কিনেছে কি নামেয়ে জানান রুটি-ভাজি কিনে নিয়েছেবাবা বলেন, ‘তাড়াতাড়ি খেয়ে নিসসেটাই ছিল সাজিয়ার সঙ্গে তাঁর বাবার শেষ কথা
অপরাধী ফয়সালের দেওয়া সাক্ষ্য অনুযায়ী, রাত ১২টা ২০ মিনিটে সাজিয়ার ঘরে ধাক্কা দেন তিনিজোর করে ঘরে ঢুকে পড়েনধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দেন সাজিয়াকেএরপর নিজেকে বাঁচাতে সাজিয়া চিকার করতে থাকেনসাজিয়ার মুখ চেপে ধরেন ফয়সালএকপর্যায়ে শ্বাস রোধ করে সাজিয়াকে মেরে ফেলেনপরদিন সকাল সাতটার দিকে সাজিয়ার বাবার কাছে ওই ক্লিনিকের চিকিসক ইব্রাহীম হোসেন ফোন করেনতখনো তাঁরা জানতেন না তাঁদের মেয়ে নেইক্লিনিকের তিনতলায় সাজিয়ার কেবিনে গিয়ে দেখেন তাঁর নিথর দেহ পড়ে আছেসবাই তো মরে যায়, কিন্তু এভাবে কেন মরতে হলো আমাদের মেয়েকে?’ এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সাজিয়া আফরিনের মা-বাবা
মনিরুল ইসলাম পুলিশ কর্মকর্তাবদলির চাকরিআজ এখানে তো কাল ওখানেযখন তিনি সিলেট থেকে বদলি হলেন, তখন সিদ্ধান্ত নিলেন দুই মেয়েকে নিয়ে আর টানাটানি নয়পড়ালেখার ক্ষতি হয়তাঁরা মায়ের সঙ্গে সিলেটেই থাকুকছুটি পেলেই মনিরুল ইসলাম ছুটে যান দুই কন্যার কাছেবড় মেয়েটা বেশি মেধাবীপঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি, এসএসসি-এইচএসসিতে ভালো করে ভর্তি হলেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজেপরে মাইগ্রেশন করে চলে যান সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজেমেয়েদের কখনো কোনো সমস্যা বুঝতে দেননি সাজিয়ার মাএকাই সব করেছেনআমরা সিলেটে থাকি বলে ও চলে এলনিজের মেয়ে বলে বলছি নাএকদম অন্য রকম আমাদের মেয়েচুপচাপ, ধার্মিকনিজের মতো করে থাকতকোনো আবদার ছিল নাসব সময় ভালো ফল করেছেএই মেয়েকে নিয়ে খুব গর্ব ছিল আমারযেদিন মেয়েটি এমবিবিএস শেষ করে, সেদিন মনে হয়েছে, আমার মেয়ে দেশের সম্পদগত বছরের ১৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া হলো না সাজিয়ারএমন মেয়েকে এ রকম নির্মমভাবে কেন যেতে হলো?’ কাঁদতে কাঁদতে যখন সাজিয়ার মা প্রশ্ন করেন, উত্তর মেলে নাবাবার চোখের পানি শুকিয়ে গেছেশোকে যেন পাথর হয়ে গেছেনসাজিয়ার ঘরে ঢুকে তাঁর বাবা কিছু বই নিয়ে আসেনদেখেন, আমার মেয়ের এফসিপিএস দ্বিতীয় পার্টের বইনিজ হাতে বাঁধিয়ে দিয়েছিযাতে একটা একটা করে বই নিয়ে পড়তে পারে
সাজিয়ার মনটা উদার ছিলকারও কষ্ট দেখলে সহ্য করতে পারতেন নাএকবার নিজের মাটির ব্যাংক ভেঙে লিভার সিরোসিসের এক রোগীকে টাকা দিয়েছিলেনমেয়েকে নিয়ে মা-বাবার কত স্বপ্ন ছিলমা তো বলেই দিয়েছিলেন, শোন, বড় চিকিসক হলেও গরিব মানুষের কাছ থেকে টাকা নিবি নাকিন্তু বাবা তো মনের কথাটা বলতে পারেননিভেবেছিলেন, মেয়ের এফসিপিএস শেষ হলে বলবেন পুলিশের কোনো পরিবার ও তাঁদের গ্রামের কোনো মানুষ চিকিসার জন্য এলে যেন টাকা না নেনবাবার মনের কথা মনেই রয়ে গেল
সাজিয়ার সহকর্মী চিকিসক ইব্রাহীম হোসেন বলেন, ‘এটি খুবই দুঃখজনক ঘটনাআমরা কখনো ভাবতেই পারিনি এমন হতে পারেক্লিনিকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও এমনটা হলোএই ক্লিনিকে চারজন নারী চিকিসক আর আমি একা পুরুষ চিকিসকফলে তাঁদের নিরাপত্তার কথা আগে ভাবে ব্র্যাকতবুও কীভাবে যে ঘটনাটা ঘটলতবে ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সাজিয়া আপুর পরিবারকে যথাযথ সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে
সাজিয়া হত্যা মামলার অভিযোগপত্র এখনো দাখিল হয়নিসাজিয়ার পরিবার চায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে যেন ফয়সালের বিচার হয়ফয়সাল বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক আছেনসবকিছু একসময় হয়তো আগের মতো হয়ে যাবেকিন্তু সাজিয়ার মা-বাবার মনের ক্ষত কি শুকাবে? চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার বালিথুবা গ্রামের প্রথম চিকিসক মেয়েটিকে নিয়ে তাঁদের স্বপ্ন ভেঙে গেল
সাজিয়ার মা-বাবার আক্ষেপ, ‘সাজিয়া মারা যাওয়ার পর কোনো পত্রিকা বা টেলিভিশন থেকে কেউ আসেননিআপনারাই প্রথম এসেছেনটেলিফোনে কেউ কেউ কেউ কথা বলেছেনকিন্তু পাশের দেশ ভারতে ধর্ষণের শিকার মেয়েটার জন্য সারা দেশে কত আন্দোলন-প্রতিবাদ হলোআমার মেয়েটা জীবন দিয়ে নিজের সম্মান রক্ষা করেছেঅথচ তার জন্য কিছুই হলো নাপ্রতিবাদ ও বিচার হলে আর কেউ এ ধরনের কাজ করতে সাহস পাবে না
সন্তানহারা এই মা-বাবাকে কোনো সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাইনিকিন্তু আমরা সবাই এক হয়ে বিচার তো চাইতেই পারিদামিনীর জন্য সারা ভারতের মানুষ একত্র হয়ে আন্দোলন করেছেআমরাও তো সাজিয়ার হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইতে পারিযদি সবাই এক হয়ে আন্দোলন করি, তাহলে ভবিষ্যতে আরও ১০টি মেয়ে কর্মক্ষেত্রে গিয়ে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পাবেন

 

শেয়ার করুন