চমক সৃষ্টিকারী: ‘দিনবদলের সনদ’

0
48
Print Friendly, PDF & Email

(৭ জানুয়ারী):২০০৮ সালের শেষ দিকেনবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অন্যান্য দলের মতো একটি নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে আওয়ামী লীগতার শিরোনাম চমক সৃষ্টিকারী: দিনবদলের সনদসেই নির্বাচনে দলটির ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের পেছনে দিনবদলের সনদেরবড় রকমের প্রভাব ছিল বলে অনেকের ধারণাদলটি ক্ষমতায় গেলে কী করবে তার অঙ্গীকার ছিল ওই নির্বাচনী ইশতেহারেসে অঙ্গীকারের ভিত্তিতেই যখন জনগণ ভোট দেয়, তখন সেটিকে জনগণের সঙ্গে দলটির চুক্তি বলেই গণ্য করা চলেযেসব ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ছিল, জনপ্রশাসন তার অন্যতম
জনপ্রশাসন নিয়ে অঙ্গীকার ছিল অনেকএকটি হলো প্রশাসনের দলীয়করণদিনবদলের সনদে বলা হয়, ‘দলীয়করণমুক্ত অরাজনৈতিক গণমুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা হবেযোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা হবেআমরা দেখছি, শুধু সচিবালয়কেন্দ্রিক পদেই এ চার বছরে সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব পদে কয়েক দফায় এক হাজার ৮৪৩ জন কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েছেনএটা করতে গিয়ে ১৯৮২ থেকে ১৫শ বিসিএস ব্যাচ পর্যন্ত অতিক্রান্ত হয়েছেন ৯৩২ জন কর্মকর্তাঅনুপাত হিসেবে এটাকে অস্বাভাবিক বলা যাবে নাতবে অস্বাভাবিক হচ্ছে অতিক্রান্ত কর্মকর্তারা অনেকেই মেধাতালিকায় পদোন্নতি প্রাপ্তদের ওপরেচাকরিজীবনে নিষ্ঠা ও দক্ষতার ছাপ এবং সততার সুখ্যাতিও আছে অনেকেরএখন অবশ্য দায়িত্বশীল মহল থেকে বলা হচ্ছে, শুধু যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও মেধা থাকলেই হবে না; থাকতে হবে দেশপ্রেমদেশপ্রেমবর্জিত কোনো ব্যক্তির চাকরিতে প্রবেশের বা টিকে থাকার কোনো সুযোগই নেইকিন্তু বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনে দেশপ্রেমের জন্য কোনো নম্বর নেইতাহলে কোনো কর্মকর্তার দেশপ্রেম যাচাই-বাছাই করা হবে কীভাবে? কারা তা করবেন? তা ছাড়া এই মানদণ্ডটির কথা তো দিনবদলের সনদেও নেইএ ধরনের মানদণ্ডের কথা নেই পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিধিমালায়ওতাহলে কি নিছকই রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত কারণে এ মানদণ্ডে বাদ দেওয়া হচ্ছে না অনেক যোগ্য কর্মকর্তাকে? আর সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে তুলনামূলকভাবে কম যোগ্য কর্মকর্তাকে উচ্চপদে আসীন করারশূন্য পদসংখ্যার অনেক বেশি পদোন্নতি দেওয়ার ফলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যককে মূল পদে পদায়ন করা যায়নিপদবির উন্নতি হলেও কাজ করতে হচ্ছে অধস্তন আসনেসুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না প্রাধিকার অনুসারেবিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) রয়েছেন সচিব থেকে সহকারী সচিব পর্যায়ে প্রায় ৬০০ জনওএসডিদের বেশ কিছু এ অবস্থায় আছেন বছর চারেকএসব থেকে তো মনে করার কোনো কারণ নেই যে দিনবদলের সনদ এ ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের কোনো সদিচ্ছা আছেএ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য কোনো অর্থ, জমি, সময় কিংবা বৈদেশিক কারিগরি সহায়তার আবশ্যকতাও নেইএকমাত্র আবশ্যকতা রাজনৈতিক সদিচ্ছাআবার দিনবদলের সনদে উল্লেখ না থাকলেও সরকারি চাকরির বয়স বৃদ্ধিতে আপাত কিছু সমস্যার সৃষ্টি করলেও সুফল দেবে নিকট ভবিষ্যতে
অঙ্গীকার ছিল, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত, আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা হবেআধুনিক যুগোপযোগী করতে হয়তো টাকা ও কিছু সময়ের প্রশ্ন রয়েছেতবে এ ক্ষেত্রে কতিপয় ইতিবাচক পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছেকিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়েছে কি? এসব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মুখ্য পুলিশ বাহিনীতে সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন সব ক্ষেত্রে বিপর্যয়কর দলীয়করণ করা হয়েছেকোনো রাখঢাক নেই এতেরাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণরত রাজনৈতিক নেতাদের রাজপথে প্রহারকারী পুলিশ কর্মকর্তা অনেককে ডিঙিয়ে পদোন্নতি পান বিগত জোট সরকারের সময়ের মতোইঘটে ভালো পদায়নএতে অবনমিত হয় পেশাদারিত্বধারাবাহিকতা আগের জোট সরকারেরইতাহলে দিনবদলের সনদ রইল কোথায়?
পুলিশ সংস্কার ও সিভিল সার্ভিস নিয়ে দুটো আইন করার বিষয়ে দিনবদলের সনদে সুস্পষ্টভাবে কিছু বলা হয়নিএ দুটো আইন নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনেকেই উসাহীতবে অন্যান্য বাস্তবতা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে এ-জাতীয় আইন কোনো সুফল দেবে নাঅপ্রিয় হলেও বলতে হয়, আইনি স্বাধীনতা কোনো সুফল দেয়নি দুর্নীতি দমন কমিশনকেএমনকি সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত নির্বাচন কমিশনের কিছু অতীত ইতিহাসও অভিন্নকয়েকজন প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অকালে বিদায় নিতে হয়েছে জনগণের চাপের মুখেঠিক তেমনই ২০০৭ সালের সূচনায় বিদায় নিতে হয়েছে গোটা নির্বাচন কমিশনকেসুতরাং সরকার না চাইলে আইন হলেই প্রশাসন কিংবা পুলিশ তাদের প্রভাববলয়ের বাইরে যেতে পারবে বলে যাঁরা মনে করেন, এই নিবন্ধকার তাঁদের সঙ্গে একমত হতে অক্ষমআবার জানা যাচ্ছে, সিভিল সার্ভিস আইনে বিভিন্ন পর্যায়ে সরাসরি উচ্চ পদে (লেটারাল এন্ট্রির মাধ্যমে) নিয়োগের বিধান রাখা হবেএমনিতেই রাষ্ট্রপতির কোটায় যেকোনো পর্যায়ে কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যায়আর এ ধরনের আইনি বিধান থাকলে প্রশাসনে অধিকতর রাজনীতিকীকরণ ঘটবে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে নাবর্তমান কোটাব্যবস্থার (সংরক্ষিত ৫৫ শতাংশ) আরও সম্প্রসারণের বিধান নাকি সে আইনে থাকছেএককথায় বলা যায়, এ-জাতীয় আইন সিভিল সার্ভিসের উন্নয়নের পরিবর্তে এর কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার মতোই হতে পারে
দুর্নীতি দমন সম্পর্কে দিনবদলের সনদে অনেক কথাই লেখা আছেএর একটি হচ্ছে, দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে কমিশনকে শক্তিশালী করতে হবেএ নিয়ে লেখা আর বলা অনেক হয়েছেশুধু বলা যায়, সাধারণ মানুষের কাছে কমিশনটির স্বাধীন সত্তা প্রশ্নবিদ্ধক্ষমতায় আসীন কিংবা তাদের পৃষ্ঠপোষকতাধন্য ব্যক্তিদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কমিশনের সক্ষমতা সম্পর্কে সংশয়বাদী সবাইরাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে ঘুষ ও দুর্নীতি উচ্ছেদেরঅঙ্গীকার করা হয়েছিলকিছু সেবা খাতের ওপর সাম্প্রতিক টিআইবি জরিপে দুর্নীতির ব্যাপকতা হ্রাস পাওয়ার তথ্য এসেছেএটা প্রশংসনীয়তবে প্রশংসা ম্লানও হয়ে যায় শেয়ারবাজার ধস, হল-মার্ক, ডেসটিনির মতো বড় বড় দুর্নীতির ফলেএসব বিষয়ে যথার্থ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে দৃঢ়তা লক্ষণীয় নয়পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়নি বলে সরকারের অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলছেনকিন্তু দুদক তো প্রাথমিক তদন্তে দুর্নীতি প্রচেষ্টার প্রমাণ পেয়েই মামলা করেছেতবে মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের তালিকা প্রশ্নবিদ্ধএর ফলাফল সম্পর্কে কেউ কেউ আশাবাদী হতে পারছে না
দিনবদলের সনদে আরও অঙ্গীকার আছে, ‘সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ শক্ত হাতে দমন করা হবেজঙ্গিবাদ দমনে কঠোরতা প্রদর্শন করা হয়েছেতবে সন্ত্রাসী, বিশেষ করে নিজেদের সমর্থক ছাত্রসংগঠনের সন্ত্রাসী নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা হতাশাব্যঞ্জকক্ষেত্রবিশেষে মনে হয়, একে প্রণোদনাই দেওয়া হচ্ছেবিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের অঙ্গীকার ছিলকিন্তু মাত্রার হেরফের হলেও তা চলছে এনকাউন্টার, গুম ইত্যাদি কোনো না-কোনো নামেবঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের রায় কার্যকর হয়েছেতবে জেলখানায় চার নেতার হত্যার পুনর্বিচারের জোরদার প্রচেষ্টা লক্ষণীয় হচ্ছে না২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলাটিও নিষ্পত্তি হয়নিযুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গীকার প্রতিপালনে সরকারের সদিচ্ছাই লক্ষণীয়যারা এ বিচারের বিপক্ষে, তারা একে প্রশ্নবিদ্ধ করতে সচেষ্ট হওয়া অস্বাভাবিক নয়তবে একে অকারণ প্রশ্নবিদ্ধকরণে সরকারের উচ্চপদে আসীন কিছু ব্যক্তির অযাচিত বক্তব্য দুঃখজনকআশা রাখব, বিষয়টি দ্রুত আইনানুগভাবে নিষ্পত্তি হবে
যেখানে যেটুকু সাফল্য, তার প্রশংসা সরকারের প্রাপ্যআর ব্যর্থতার ক্ষেত্রেও গ্রহণযোগ্য যুক্তির ঘাটতি রয়েছে অনেক ক্ষেত্রেতবে প্রশাসনের সর্বাঙ্গে দলীয়করণের ফলে আজ প্রতিষ্ঠানটির দক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ, কার্যকারিতা গৌণ এবং গ্রহণযোগ্যতা ন্যূনতম পর্যায়েঅথচ গণতান্ত্রিক দেশে, বিশেষ করে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রশাসনকে রাষ্ট্রযন্ত্রের ইস্পাত কাঠামোর মতো বিবেচনা করা হয়অথচ আমরা জেনেশুনে ক্রমান্বয়ে তাকে দুর্বল করছিএমনিতেই বেতন-ভাতার অপ্রতুলতা, যথাযথ মর্যাদা না থাকা, বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থার ফলে মেধাবীরা সরকারি চাকরিতে আসার আকর্ষণ হারিয়ে ফেলছেনতা সত্ত্বেও অতীতের গৌরবোজ্জ্বল উত্তরাধিকারের মোহে কিছু কিছু মেধাবী তরুণ-তরুণী এখনো চলে আসছেন এ চাকরিগুলোতেবেসরকারি খাতে উচ্চ বেতনে চাকরি করা কেউ কেউ আসছেন, এটাও দেখা যায়সরকারের সচিব পদে বেশ কিছু মেধাবী, দক্ষ ও চৌকস কর্মকর্তা সবার নজর কাড়েআর এর বিপরীতটার সংখ্যাও নেহাত কম নয়যথাযথ যাচাই-বাছাই হয়নি তাঁদের পদায়নেবুদ্ধিদীপ্ত দৃষ্টিভঙ্গি, দায়িত্বে নিবেদিত ও পরিশ্রমী, নেতৃত্বের গুণাবলি আর সততার সুনাম থাকলে একজন অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে সচিব করার কথাএ ধরনের বেশ কিছু কর্মকর্তাকে বছরের পর বছর অধস্তন পদে কিংবা ওএসডি রেখে তুলনামূলক নিম্নমানের ও কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে কতিপয় ক্ষেত্রেফল যা হওয়ার, তা-ই হচ্ছে এবং হবে
জনপ্রশাসন নিয়ে দিনবদলের সনদ একটি নতুন প্রত্যাশার সূচনা করেছিলপ্রত্যাশা ছিল দলীয়করণমুক্ত অরাজনৈতিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীযোগ্যতা, মেধা ও জ্যেষ্ঠতাই হবে পদোন্নতির ভিত্তিদুর্নীতি হ্রাস পাবে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়কিন্তু বর্তমান সমাজচিত্রটিতে এর কোনো প্রতিফলনই লক্ষণীয় নয়বরং বিপরীত চিত্রটাই প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছেএটা ঠিক, এর আগের জোট সরকারও এ ধরনের কাজ করেছিল নির্বিচারেগণিতের সংখ্যা বিচারে কোনটা কম আর কোনটা বেশি, তা বলার সুযোগ নেইআর সে জন্যই তো দিনবদলের সনদ মানুষ লুফে নিয়েছিলদেখেছিল নতুন স্বপ্নসরকারের মেয়াদ চার বছর চলে যাওয়ার পর সে স্বপ্ন ভঙ্গ হতে বাকিই আর থাকে কী? শেষ বছরটিতে তারা কি বিষয়টি খতিয়ে দেখবে? একটি বছর তো একেবারেই কম সময় নয়আর আশা নিয়েই তো ব্যক্তি কেন, সমাজও টিকে থাকেসে আশা নিয়েই রইলাম
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

 

 

 

শেয়ার করুন