ক্রমেই প্রবল হচ্ছে মহাজোট ও বিরোধীদল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট বিরোধীদের কণ্ঠ

0
84
Print Friendly, PDF & Email

ঢাকা (০৭ জানুয়ারী) : ক্রমেই প্রবল হচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ও প্রধান বিরোধীদল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট বিরোধীদের কণ্ঠ। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ব্যানারে এসব বিরোধী শক্তি তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য-বিবৃতিতে প্রধান দুই রাজনৈতিক বলয়ের বিকল্প গড়ে তোলা, দুই নেত্রীর অবসর, সর্বপরি জনগণের শক্তির আত্মপ্রকাশের দাবি ও সম্ভাবনা তুলে ধরছেন। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের মেয়াদ যখন শেষের দিকে, ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদলের পরস্পর বিরোধী অবস্থান যখন তুঙ্গে, তখন এসব কণ্ঠ ক্রমেই প্রবল ও সক্রিয় হচ্ছে।
 
সামাজিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক মোর্চার আদলে এসব শক্তি জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের অবিরত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব প্রক্রিয়ায় নতুন কিছু মুখ দেখা গেলেও অধিকাংশই প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের পদবঞ্চিত কিংবা বিভিন্ন কারণে সম্পর্ক ছেদ করা রাজনীতিক। তারা বৃহত্তর ঐক্য গড়ার কথা বললেও মূলতঃ স্ব-স্ব রাজনৈতিক মোর্চা বা সামাজিক আন্দোলনের ব্যানারেই নিজেদের ব্যক্তি গ্রহণযোগ্যতা ও মেধা-প্রজ্ঞার মাধ্যমেই রাজনৈতিক ‘পরিবর্তন’ আনার কথা বলে যাচ্ছেন।

জাতীয় বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সভা-সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক, মানববন্ধন কিংবা মধ্যরাতের টিভি টকশো’ কিংবা সংবাদমাধ্যম আয়োজিত রাজনৈতিক সংলাপে অংশ নিয়ে এসব কথা জানান দিচ্ছেন তারা। এরইমধ্যে দু’একটি রাজনৈতিক দল দুই নেত্রীর অবসর, প্রধান রাজনৈতিক দুই বলয়ের বিকল্পসহ জাতীয় অন্যান্য ইস্যুতে হরতালও পালন করেছে।
 
‘রাজনৈতিক পরিবর্তন’ আনার পক্ষে অবস্থান নেওয়া এসব শক্তির পরস্পরের সঙ্গে মতদ্বৈধতা থাকলেও তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে অনেকটাই অভিন্ন সুর পরিলতি হচ্ছে।

রাজনীতির মাঠে উত্তাপ ছড়ানো এসব সামাজিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক মোর্চার মধ্যে সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন এবং বিকল্প ধারার প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর জাতীয় ঐক্যের ডাক, আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও ডাকসুর ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য, অধ্যাপক ড. শাহেদা ও কামরুল হাসান নাসিমের নেতৃত্বাধীন গড়বো বাংলাদেশ বিপ্লবী দল ও ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাকেই বেশি সক্রিয় দেখা যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)সহ বেশ কয়েকটি বাম সংগঠন প্রধান দুই রাজনৈতিক বলয়ের বিরোধিতা করে নিজেদের পক্ষে জনমত গঠনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনার কথা বলে আসছেন।

এসব রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের বাইরেও সুশীল সমাজের ব্যানারে একাধিক ব্যক্তি ও সংগঠন রাজনৈতিক পরিবর্তনে’র পক্ষে বার বার তাদের অবস্থান তুলে ধরছেন।  তাদের  মধ্যে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিকও রয়েছেন।
 
তাদের মধ্যে সাবেক এটর্নি জেনারেল ও সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক, প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মুসা, স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী, আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাঈদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. তুহিন মালিক প্রমুখের ভূমিকা পরিলক্ষিত হচ্ছে। সম্প্রতি আইন বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম আয়োজিত ‘গণতন্ত্র ও চলমান রাজনীতি’ শীর্ষক অনলাইন সংলাপে  বলেন, ‘‘মানুষ এখন পরিবর্তন চায় । ২০১৪ সালের পর প্রধানমন্ত্রীসহ অনেককেই দেশের মানুষ আর ক্ষমতায় দেখতে চাইবে না।’’

চলমান রাজনৈতিক টানাপড়েন থেকে দেশ ২০১৪ সালে মুক্তি পাবে এবং এ লক্ষ্যে সারাদেশ থেকে ভালো মানুষ খুঁজে বের করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। অন্যদিকে, ২১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে দুই নেত্রীর স্বেচ্ছায় অবসরের দাবি জানিয়েছেন অধ্যাপক ড. শাহেদা ও কামরুল হাসান নাসিমের নেতৃত্বাধীন ‘গড়বো বাংলাদেশ বিপ্লবী দল’। অন্যথায় ২২ ফেব্রুয়ারি নতুন প্রজন্ম নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির উদ্যোগ নেবে বলেও ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

গত ২ জানুয়ারি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
এছাড়া একাধিক টিভি টকশো’তে অংশ নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক জোটের কড়া সমালোচনা এবং দুই নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অগণতান্ত্রিক-স্বৈরাচারের অভিযোগ তুলে আসেছেন- এবিএম মুসা, নূরে আলম সিদ্দিকী, মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ অনেকে। তবে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না অবশ্য দুই রাজনৈতিক বলয়ের বিকল্প বলয় গড়ে তোলার কোনো আন্দোলন করছেন না বলে দাবি করেছেন।

তিনি এ বিষয়ে বাংলানিউজকে বলেন, ‘‘দেশে গণতন্ত্র বিনির্মাণে গণতান্ত্রিক চরিত্রগত দল লাগবে। দেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিও তাদের চরিত্র বদলে গণতান্ত্রিক হতে পারে। আমি একটা দলে ছিলাম, সেখানে আমি গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছি-শেষ পর্যন্ত আমি  থাকতে পারিনি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবেই জনগণের স্বকীয় স্বাধীন উদ্যোগ উন্মোচিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’’ ‘‘রাজনীতিতে একটি গণতান্ত্রিক সুপার স্ট্রাকচার প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় নিয়েই আমাদের আন্দোলন” দাবি করে মান্না বলেন, ‘‘রাজনৈতিক দলগুলোকে ভেতর থেকে বদলাতে হবে।

মনে রাখতে হবে ইতিহাস কারো জন্যই স্থায়ী নয়। আমি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখি না, প্রত্যাশা রাজনীতিতে একটি গণতান্ত্রিক সুপার স্ট্রাকচার প্রতিষ্ঠিত হোক।’’ আ’লীগের সাম্প্রতিক কাউন্সিলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘‘শেখ হাসিনা কাউন্সিলরদের অধিকার কেড়ে নিয়েছেন। তিনি সভাপতি থাকতেন তাতে আপত্তি ছিলো না, তবে কাউন্সিলরদের মতামত দেওয়ারও সুযোগ থাকা উচিৎ ছিলো। কাউন্সিলে যা হয়েছে, তা গণতন্ত্রে হতে পারে না। এ লড়াই দলে আমিই প্রথমে শুরু করেছিলাম।’’

সাধারণ মানুষের মাঝেও পরিবর্তনের আকাঙ্খার একটি বোধ তৈরি হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘‘১/১১ এর অনেক আগে থেকেই আমি এ পরিবর্তনের কথা বলে আসছি। এখন আমি সুখী  এজন্য যে, এখন অনেকেই এসব কথা বলছেন। দেখতে পাচ্ছি সাধারণ মানুষের মাঝেও বর্তমান রাজনীতি নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হচ্ছে। তাদের মধ্যে পরিবর্তনের একটি বোধ তৈরি হয়েছে। আমি অত্যন্ত আশাবাদী-একটি পরিবর্তন নিশ্চয়ই আসবে।’’

তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের এসব তৎপরতা ও দুই নেত্রীর অবসর দাবির বিষয়ে যারা আওয়াজ তুলছেন, তাদের এখনো সামর্থ্য সেই পর্যায়ে পৌছেনি বলে দাবি প্রধান বিরোধী দল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তিনি মনে করেন, এটি একটি পুরনো প্রক্রিয়া। তবে রাজনৈতিক চেতনা থেকে পরিবর্তন চাওয়ার অধিকার থাকলেও বিশেষ কোনো মহল তাদের দিয়ে এসব কথ‍া বলাতে পারেন। নজরুল ইসলাম খান বলেন, “রাজনৈতিক চেতনা থেকে কেউ এসব পরিবর্তন, দুই নেত্রীর অবসর ইত্যাদি চাইতেই পারেন। তবে যারা এসব দাবি তুলছেন, তার‍া যদি নিজেদের সেই পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত না করে এসব বলেন, তবে তা সবার কাছে হাস্যকর হবে। আর নিজেদের সেই পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত না করে যারা দুই নেত্রীর অবসর চান, তাতে কেউ গুরুত্বও দেয় না। তাদের অধিকারও জন্মায় না সেই দাবি করার।’’

তিনি মনে করেন, নিজের চেতনা থেকে না বলে কেউ কেউ অন্যের দ্বারা প্ররোচিত হয়েও এসব দাবি তুলতে পারেন। অতীতে এরকম অনেক দৃষ্টান্তও রয়েছে, যাদের পরবর্তীতে আবার মূলধারার কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড় বৃত্তি করতেও দেখা যায়।

বিএনপিও রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন চায় উল্লেখ করে এ বিএনপি নেতা বলেন, ‘‘কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখি না। রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য সামর্থ্য সঞ্চয়ের বিষয় রয়েছে। এখন পর্যন্ত কারোর তা অর্জন হয় নাই।’’
রাজনীতির বিবর্তনের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘‘নতুনদের আকাঙ্খার গুরুত্ব না দিলে রাজনৈতিক দল এগুতে পারে না। নতুন প্রজন্মের চাওয়ার পথে রাজনীতি হাঁটতে বাধ্য। এর সঙ্গে যারা সঙ্গতি রেখে এগুবে তারাই টিকবে। অন্যথায় ছিটকে পড়বে, যেমন মুসলিম লীগ, ন্যাপ টিকে থাকতে পারেনি। কারণ তারা নতুনের আকাঙ্খার মূল্য দেয়নি।’’

আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা, উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও দপ্তরবিহীনমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও প্রায় একই রকম প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পরিবর্তনের দাবি তোলা এসব ব্যক্তিকে নিজেদের দলীয় কাঠামো আরো সুসংহত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘‘জনগণের সত্যিকারের কণ্ঠ নিয়ে যদি কেউ আসতে পারেন, সেই সব রাজনৈতিক শক্তিকে ওয়েলকাম জানাবো। কারণ আ’লীগ বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে।’’

পরিবর্তন চাওয়া এসব শক্তির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘‘যারা এসব কথা বলেন, তারা কারা? তাদের ভিত্তি কি? আমাদের কাউন্সিলে (আ’লীগের কাউন্সিল) সারা দেশ থেকে ২০ হাজারের বেশি কর্মী হাজির হয়েছেন, বিএনপি করলেও এরকম হবে। যারা দুই নেত্রীর অবসর চান, তাদের বলবো- ভোটে যাক, নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করুক।’’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. মিজানুর রহমান শেলী মনে করেন, কেবল জনঅসন্তোষকে পুঁজি করেই এ পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়, এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করা।

তিনি বলেন, ‘‘বর্তমানে যে সব শক্তি প্রধান দুই রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে তৃতীয় আরেকটি শক্তি গড়ে তোলার পক্ষ নিয়েছেন, তাদের অবস্থান যাই হোক না কেন, তারা রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে বা জনগণের কাছে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারেন নি। এ শক্তিকে বাস্তব শক্তিশালী রূপ দিতে হলে কেবল জনঅসন্তোষকে ঘিরেই পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তাদের রাজনৈতিক প্রস্তুতি এবং সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোল‍ার ক্ষমতাও অর্জন করতে হবে। যারা এ কাজ যতো ঐক্যবদ্ধভাবে করতে পারবেন, তারাই তৃতীয় শক্তির উন্মেষ ঘটাতে পারবেন।’’

বহির্বিশ্বে এ ধরনের পরিবর্তন হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘‘সামরিক শাসনের হস্তক্ষেপ ছাড়াও ইউক্রেন, জর্জিয়ার মতো দেশে  এ ধরনের পরিবর্তন হয়েছিলো।’’ তিনি আরো উল্লেখ করেন, ‘‘প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে যতোই অভিযোগ থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে স্বল্প সময়ে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে উঠবে বলে মনে হয় না। কারণ হচ্ছে, রাজনৈতিকভাবে প্রবল শক্তি বা সংগঠনকে মোকাবেলা করতে আদর্শ বা মনোভাবই মূল উপাদান নয়। রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার বা বিকল্প অবস্থান তুলে ধরার শক্তিও থাকতে হবে।’’

নিউজরুম

শেয়ার করুন