অন্ধকার এক ছোট্ট ঘরে দু`বছর ধরেই ঘুমিয়ে আছেন দুরন্ত কিশোরীটি

0
100
Print Friendly, PDF & Email

 

কুড়িগ্রাম (৭জানুয়ারী) : অন্ধকার এক ছোট্ট ঘরে দু`বছর ধরেই ঘুমিয়ে আছেন দুরন্ত কিশোরীটি। ডানে বায়ে খালি নেই। সাড়ে তিন হাত উপরে কবরের মাটি জুড়ে ফুল আর ফুল। লাল টুকটুকে মোরগ আর গাঁদা ফুল। সে ফুল আর ফেলানী দেখতে পাচ্ছে না। অবুঝ ফেলানীকে পৃথিবীর এ রং- রূপ- গন্ধ দেখার সুযোগ দেয়নি ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)। কাঁটাতারেই আটকে গেছে কিশোরীর স্বপ্ন। এক প্রাণহীন ঘুমে দুরন্ত ফেলানী।  

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি অবুঝ বাংলাদেশি এ কিশোরীকে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী সীমান্তে নির্মমভাবে হত্যা করে বিএসএফ’র সদস্যরা। সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ায় পাঁচ ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখা হয় ফেলানীর লাশ। পরে বিএসএফ সদস্যরা তার দুই হাত ও পায়ের ফাঁকে বাঁশ ঢুকিয়ে তাকে বহন করে নিয়ে যায়। বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়ে যায় এ দৃশ্য। ফেলানীর সেই লাশ ছিল অরক্ষিত, বিপন্ন, রক্তাক্ত সীমান্তের জ্বলন্ত সাক্ষ্য।
 
ফেলানী হত্যার দু`বছর গেলেও আজও যেনো শুকায়নি ফেলানীর মা জাহানারা বেগমের চোখের জল। ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম আজও কবরের পাশ দিয়ে গিয়ে বুক চাপড়ান! মেয়ে হারানোর ক্ষত নুর ইসলামের আজো শুকায় নি। হারানো সন্তানের কাপড় নাকে দিয়ে এখনও ফেলানীর শরীরের গন্ধ নিয়ে সে পোশাক বুকে চেপে ধরে নুর ইসলাম আর জাহানার যেনো ফেলানীকে তাদের বুকে ফিরে পান।
 
সরেজমিনে ফেলানীর বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, রামখানা ইউনিয়নের মরাটারী গ্রামের বাড়ির একটি ঘরে কোন রকমে মাথা গুঁজে আছে ফেলানীর বাবা-মা ও ভাই-বোনরা। ঘরটির সামনের অংশে একটি ছোট মুদি দোকান দিয়েছে মা জাহানারা। নাখারগঞ্জ বাজারে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন ও বিজিবির দেওয়া অপর দোকানটি চালাচ্ছেন বাবা নুর ইসলাম।

 

তিনি জানান, দোকান দুটিতে একবছর আগে প্রতিদিন এক হাজার টাকার মালামাল বিক্রি হলেও মালামাল না থাকায় তা কমে দাড়িয়েছে ৩০০/৪০০ টাকায়। যা লাভ হয় তা দিয়ে সন্তানদের লেখাপাড়া ও সংসার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
 
ফেলানীর মা জাহানারা বেগম আবেগঘন কন্ঠে বলেন, “মেয়ের মুখ চোখে ভাসে বারবার, আর আচলে মুখ মুছে আল্লার কাছে বিচার দিই।“

 

জীবিকার সন্ধানে এভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আর যেন কোন ফেলানীকে জীবন দিতে না হয়। আর যেন কোন মায়ের কোল খালি না হয় এমন প্রত্যাশা নিহত কিশোরীর মায়ের।

 

ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম জানান, সন্তান হারালেও বর্তমান মহাজোট সরকার আমার পরিবারকে ফিরিয়ে দিয়েছে এটা আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমার বাড়িতে এসে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ফেলানীর কবর ও রাস্তা পাকা করাসহ সবসময় পাশে থাকার। কিন্তু এ দুইবছরে সরকারের কেউ কোনো খোঁজ রাখেনি।  

 

জানাগেছে, হত্যাকাণ্ডের পর ২০১১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের দক্ষিণ রামখানা কলোনিটারি গ্রামে ফেলানীর কবর দেখতে, তার পরিবারকে সান্ত্বনা ও আর্থিক সাহায্য দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এমপি, কুড়িগ্রাম-১ আসনের এমপি মোস্তাফিজুর রহমান, কুড়িগ্রাম-২ আসনের এমপি মো. জাফর আলীসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ছুটে যান। সে সময় ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলামসহ এলাকার শত শত মানুষ তাদের কাছে এসব দাবি জানান। কিন্তু সেসব দাবি আজও আলোর মুখ দেখেনি।Falani-r-kobor
 
ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম জানান, মেয়ের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সীমিত আয়োজনে সোমবার দুপুরে (জোহরের নামাজের পর) পরিবারের পক্ষ থেকে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
 
কুড়িগ্রাম বিজিবি স‍ূত্রে জানা যায়, কুড়িগ্রামের বিভিন্ন সীমান্তে ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বিএসএফের গুলিতে মৃত্যু হয়েছে ৭ বাংলাদেশির,  গোলাগুলি হয়েছে ৫৬ বার। এই জেলার বিএসএফের হাতে আটক হয়েছে ১১১ জন, এখনও ভারতের জেলে বন্দি রয়েছে ৮১ জন মানুষ। আবার ১৪ জন ভারতীয় আটক হয়ে বাংলাদেশের জেলে থাকার পর সম্প্রতি ফেরত দেওয়া হয়েছে ৮ জনকে। এখনো জেলে বন্দি রয়েছে ৬ জন ভারতীয়।
 
তবে সীমান্তবাসীদের ধারণা ভারতীয় বিএসএফ’র হাতে আটকের সংখ্যা আরো অনেক বেশি। দুই দেশের সমঝোতা চুক্তি, বার বার সীমান্তে গুলি বন্ধের ঘোষণাও আশ্বস্ত করতে পারেনা তাদের। তাই আতংকও কাটে না সীমান্তবাসীর।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয় রাজ্য ঘেষা ২৬৮ কিলোমিটার কুড়িগ্রাম জেলার সীমান্তের মানুষকে জীবিকার তাগিদে সীমান্ত লাগোয়া জমিতে কাজে গেলেই হত্যা বা নির্যাতনের শিকার হতে হয় প্রায়ই।
 
কুড়িগ্রাম-১ আসনের স্থানীয় সাংসদ মোস্তাফিজার রহমান জানান, সরকার দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে ভ‍ূমিকা নেবে। আর বাংলাদেশি বন্দিদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেবে। ফেলানীর পরিবারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নেরও উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে কুড়িগ্রামের সীমান্তের মানুষ আশা করছে  সীমান্তে গুলি বন্ধ হবে, শান্তি  আসবে। নির্ভয়ে নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারবে সীমান্তবাসীরা।
সীমান্তবর্তী যুবক বিশ্বজিত রায় বলেন, গরু-ছাগলও সীমান্তে যায় ঘাস খেতে। সেটা আনতে গেলেই তারা চোরাকারবারী ভেবে গুলি করে, ধরে নিয়ে যায়।   
 
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি শুক্রবার ভোর সোয়া ৬টার দিকে ভারতীয় বিএসএফ’র গুলিতে বিদ্ধ হয়ে আধাঘন্টা ছটফট করে নির্মমভাবে মৃত্যু হয় কিশোরী ফেলানীর। এর পর সকাল পৌনে ৭টার থেকে তার নিথর দেহ কাঁটাতাঁরের উপর ঝুলে থাকে দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা।

পরে বিএসএফ লাশ নামিয়ে ভারতে  নিয়ে যায়। এরপর বিশ্বব্যাপী তোলপাড় শুরু হলে মৃত্যুর ৩০ ঘণ্টা পর ৮ জানুয়ারি শনিবার লাশ ফেরত দেয় বিএসএফ। ৬ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন কুড়িগ্রামে এসে ফেলানীর বাবার হাতে অনুদানের ৩ লাখ টাকা তুলে দিয়ে মা ও ভাই-বোনদের ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি নিচ্ছিদ্র গোপনীয়তায় সারাদিন লুকোচুরি খেলা শেষে বিকেলে মা ও ভাই-বোনদের বাংলাদেশে ফেরত দেয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।

নিউজরুম
 

শেয়ার করুন