তুরস্ক মিসর ও বাংলাদেশ : সেকুলার-ইসলামপন্থী দ্বন্দ্ব

0
135
Print Friendly, PDF & Email

৬ জানুয়ারি, ২০১৩।।

অবশেষে নানা জল্পনার অবসান ঘটিয়ে মিসরের প্রস্তাবিত সংবিধান গণভোটে অনুমোদিত হয়েছে। মিসরের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ সাংবিধানিক পরিষদ কর্তৃক প্রণীত সংবিধানে সম্মতি দিয়েছে। দেশটির সেকুলার ও বামপন্থীরা সংবিধানটি অধিকতর ইসলামি বলে অভিযোগ এনে এর বিরোধিতা করেছিল। মিসরের জনগণ সংবিধান প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ইসলামি আদর্শ প্রভাবিত সংবিধানের পে এবং সংখ্যালঘিষ্ঠ অংশ ছিল এর বিপক্ষে। গণতন্ত্রে এটিই স্বাভাবিক। গণতন্ত্র হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন।

মিসরের মতো বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শের বিতর্কটি সাম্প্রতিক কালে বেশ খানিকটা প্রকট হয়ে উঠেছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল জামায়াতসহ ধর্মীয় ও সম্প্রদায়ভিত্তিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানায়। এমনকি সিপিবি ও বাসদ হরতাল আহ্বান করে তাদের দাবি তুলে ধরার উদ্যোগ নেয়। এর পাল্টা হরতালও হয়। রাজনীতি বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এসব ঘটনা নতুন কিছু নয়। উপনিবেশ-উত্তর মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলামপন্থী বনাম বাম-সেকুলারদের আদর্শিক ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াইকে একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবেই বিবেচনা করা যেতে পারে। সম্প্রতি তুরস্ক, মিসর ও বাংলাদেশে এ লড়াই চোখে পড়ার মতো। এসব দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আদর্শিক লড়াইয়ের কমবেশি একই চিত্র পাওয়া যাবে।

১৯২৪ সালে মুসলিম ঐক্যের প্রতীক তুর্কি খেলাফতের অবসানের পর বেশির ভাগ মুসলিম দেশেই জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সেকুলারিজমের উত্থান ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সম্পর্কের একজন বিশেষজ্ঞ হার্ভার্ড ল স্কুলের প্রফেসর নোয়াহ ফেল্ডম্যান ২০০৮ সালে প্রকাশিত তার The Fall AND Rise Of The Islamic State গ্রন্থে মন্তব্য করেন, বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে মুসলিম বিশ্বে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। মধ্যপ্রাচ্য ও বিভিন্ন মুসলিম দেশে রাজা-বাদশাহ ও স্বৈরশাসকেরা নিজ নিজ দেশে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার পরিচয় দেয়; ফলে এসব দেশে সংস্কারের ধারণা তীব্র হতে থাকে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্রের পতনের পর পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে উদারনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু লণীয় বিষয় হলো, মুসলিম দেশগুলোর সচেতন জনগোষ্ঠী রাজা-বাদশাহ ও স্বৈরশাসকদের হটিয়ে উদারনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। পাশ্চাত্যের পণ্ডিতদের কাছে এখন এটি একটি বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে। কাসিক্যাল ইসলামি রাষ্ট্র (অটোম্যান সাম্রাজ্য) বিশ্ববীণ সম্পর্কে পশ্চাৎপদ ধ্যান-ধারণার আবর্তে পড়ে উপনিবেশের করালগ্রাসে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মুসলিম বিশ্বকে জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের নামে ভেঙেচুরে বহু জাতি-রাষ্ট্র সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু এসব দেশে আজো স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সরকারগুলো একে একে ব্যর্থ হয়েছে। কেন এমন হলো? বেশির ভাগ পণ্ডিত মনে করেন, মুসলিম বিশ্বের জনগণের ধারণা হলো, সমাজতন্ত্র ও সেকুলারিজমকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করার কারণেই জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রগুলো ব্যর্থ হচ্ছে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে সীমিতসংখ্যক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ইসলামের পুনর্জাগরণের ডাক দেন। তবে সমাজতন্ত্র ও সেকুলার জাতীয়-রাষ্ট্রগুলো ব্যর্থ হতে শুরু করলে জনগণ বলতে শুরু করে, ইসলামি আদর্শকে একবার সুযোগ দিয়ে দেখা যাক না। নোয়াহ ফেল্ডম্যানের মন্তব্যকে বাস্তবতার আলোকে পর্যালোচনা করা যাক। এ প্রসঙ্গে আমরা তুরস্ক, মিসর, ইরান ও বাংলাদেশের ইতিহাসকে পর্যালোচনা করতে পারি।

প্রথমেই তুরস্ক। ১৯৩৭ সালে অনুমোদিত তুর্কি সংবিধানে ‘সেকুলারিজম’কে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। সংবিধানে আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে ইসলামের প্রভাব মুছে দিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু মুসলিম অধ্যুষিত তুর্কি সমাজে ইসলামি সংস্কৃতি যে যুগ যুগ ধরে চলে আসছিল তাকে উপো করা বাস্তবে সম্ভব ছিল না। কামাল আতাতুর্ক (জাতির পিতা) ইসলামি সংস্কৃতি প্রভাবিত একটি সমাজকে পাশ্চাত্য ধাঁচে সংস্কার করার জন্য সেকুলার সাংস্কৃতিক ও স্বৈরতান্ত্রিক শিা চালুর উদ্যোগ নেন। তিনি ইসলামি সংস্কৃতি ও জীবনাচারকে নির্মূল করতে এমন পদপে নেন, যা অন্য কোনো মুসলিম দেশে নেয়া হয়নি। সব কুরআনিক স্কুল ও অন্যান্য ধর্মীয় শিাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। ইসলামি আইনের পরিবর্তে সুইস আইন, জার্মান ট্রেড ও কমার্শিয়াল আইন এবং ইতালীয় ফৌজদারি আইন প্রবর্তন করা হয়। আরবি বর্ণমালার পরিবর্তে ল্যাটিন বর্ণমালা চালু করা হয়। মেয়েদের ইসলামি পোশাকের পরিবর্তে ইউরোপীয় স্কার্ফ পরিধানে বাধ্য করা হয়। নামাজের সময় সেজদা দেয়ার পরিবর্তে খ্রিষ্টানদের মতো চেয়ারে বসে প্রার্থনা করার রীতি প্রবর্তন করা হয়। এসবের মধ্য দিয়ে কামাল পাশা অনেকটা মোগল সম্রাট আকবারের ‘দীন-ই-এলাহী’র মতো একটি নতুন ধর্ম ‘কামালী ইসলাম’ চালু করে। কামালের এসব কাজ তুর্কি মুসলিম সমাজে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করলেও বড় প্রতিরোধের ঘটনা ঘটেনি।

কামাল পাশার ‘রিপাবলিকান পিপলস পার্টি’ ১৯২৭ সাল থেকে দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশ পরিচালনা করে। অবশেষে ১৯৪৬ সালে বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র চালু করা হয়। কামালতন্ত্রের আওতায় ইসলামি মূল্যবোধ ব্যাপকভাবে তিগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন দল ইসলামের পুনরুজ্জীবনের স্লোগান দিয়ে রাজনীতিতে সাফল্য লাভ করার প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। ১৯৫০ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়া ২৪টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তত সাতটি দল ইসলাম ধর্মের অধিকতর ভূমিকার সপে অবস্থান নেয়। এ নির্বাচনে আদনান মেন্দারেসের নেতৃত্বে ইসলামমনা জাতীয়তাবাদী ডেমোক্র্যাটিক পার্টি জয়লাভ করে। মেন্দারেস মতাসীন হওয়ার সাথে সাথে বিপুলসংখ্যক বন্ধ মসজিদ খুলে দেয়া হয় ও সরকার পরিচালিত ধর্মীয় শিাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। তুর্কি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার এ পরিবর্তনকে কামালপন্থী রিপাবলিকান পার্টি ও সেনাবাহিনী ভালো চোখে দেখেনি। ১৯৬০ সালে তুর্কি সেনাবাহিনী এক অভ্যুত্থান ঘটায় এবং প্রধানমন্ত্রী মেন্দারেসকে কামালতন্ত্রী সেকুলারিজমের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। তার দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়। সামরিক অভ্যুত্থানের পেছনে দৃশ্যত কারণ ছিল, মেন্দারেস সরকার কামালতন্ত্রী, বামপন্থী ও কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ‘অ্যাকশন’-এ গিয়েছিলেন।

১৯৫০ সালে আদনান মেন্দারেসের নির্বাচনে বিজয় ছিল কামালতন্ত্রের বিরুদ্ধে তুর্কি জনগণের প্রতিক্রিয়ার বহিঃপ্রকাশ। তুর্কি জনগণ গণতান্ত্রিক পন্থায় তাদের মনোভাব প্রকাশের সুযোগ না পেলে হয়তো ধর্মীয় চরমপন্থার (religious extrimism) উদ্ভব হতে পারত। এ কথাও সত্য যে, আদনান মেন্দারেস রাজনীতির ময়দানে ইসলামের কথা বললেও তিনি মূলত এলিট শ্রেণীর বিরোধী ও সাধারণ জনগণের কাছাকাছি ছিলেন। ইসলামের প্রতি জনগণের আবেগকে তিনি ব্যবহার করেন।

১৯৬০ সালের সামরিক অভ্যুত্থান তুরস্কের রাজনীতিতে এক নতুন মোড় নেয়। এ সময় সংবিধান সংশোধন করে সামরিক বাহিনীর প্রাধান্য দিয়ে তুরস্কে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের কর্তৃত্বের পরিবর্তে সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। সামরিক আমলে আধুনিকীকরণ ও শিল্পায়নের নামে যে কঠোর কার্যক্রম গ্রহণ করা হয় তার সাথে জনগণের সম্পৃক্ততা তেমন ছিল না। ফলে ষাটের দশকে দেশটিতে ব্যাপক বেকারত্ব, উচ্চমূল্যস্ফীতি ও শহরে নির্গমন বৃদ্ধি পায়। জনগণের মধ্যে পাশ্চাত্যবিরোধী মনোভাব প্রবল হতে থাকে এবং বহু তুর্কি তাদের জাতীয় স্বকীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতে থাকে। এ সময় ইসলামি আন্দোলনের বার্তা নিয়ে আবির্ভূত হন নাজমুদ্দিন আরবাকান। তিনি তার লেখনির মাধ্যমে তুরস্কের অর্থনৈতিক ও নৈতিক অবয়ের জন্য পাশ্চাত্যকরণ প্রক্রিয়াকে দায়ী করেন। তিনি জাতীয়তাবাদী ও সেকুলার আদর্শের পরিবর্তে ইসলামি রাজনীতির নতুন ধারা সৃষ্টির পথনির্দেশনা দেন।

দেশটিতে দ্বিতীয় সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় ১৯৭১ সালে। ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ এ সময়কালে তুরস্কে রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করে। এ ১০ বছরে ১৩ বার সরকার পরিবর্তন ঘটে। এরূপ অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে তুরস্কের সামরিক জান্তা ১৯৮০ সালে আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটায়। ব্যাপক বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে জনমনে ােভ বাড়তে থাকে। এর মধ্যে আরবাকানের নেতৃত্বে হাজার হাজার লোকের এক সমাবেশ থেকে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের সমালোচনার পাশাপাশি ইরানের ইসলামি বিপ্লবকে তুরস্কের জন্য মডেল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এতে কামালপন্থীরা ুব্ধ হয়ে সামরিক জান্তাকে মতা গ্রহণে উসকানি দেয় ও পাশ্চাত্যের প্রভুরাও এতে ইন্ধন দিতে থাকে। ফলে সামরিক আইন জারি করা হয়। সামরিক জান্তা কঠোরভাবে রাজনৈতিক নিপীড়ন শুরু করে। সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। সংসদ ভেঙে দেয়া হয়। নির্বাচিত সরকারকে বাতিল করা হয়। সব সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। ৭০ লাখ লোককে ‘রাজনৈতিকভাবে সন্দেহভাজন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। ছয় লাখ ৫০ হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়। এর মধ্যে ৫১৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় এবং এর মধ্যে ৪৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরও করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দ্বিদলীয় ব্যবস্থা চালু করার ল্েয সামরিক জান্তা ইসলামপন্থী ও বামপন্থী দলগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং সংসদ নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

সামরিক সরকার রাজনৈতিক বাস্তবতার গভীরতা উপলব্ধি করে বিকল্প কৌশল নিয়ে অগ্রসর হয়। ১৯৮০ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর সামরিক সরকার ক্রমান্বয়ে ইসলামকে জাতীয়ভাবে গ্রহণ ও ধারণ করার দিকে অগ্রসর হয়। এর মাধ্যমে জাতিকেও প্রকারান্তরে ইসলামীকরণ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেকুলার কামালপন্থীদের পে সেনাবাহিনী কঠোর অবস্থান নেয়া সত্ত্বেও ইসলামি আদর্শের উত্থান প্রতিহত করা যায়নি। এরই ফলে প্রধানমন্ত্রী রজব তৈয়েব এরদোগানের নেতৃত্বে বিগত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে ইসলামপন্থী একে পার্টি তুরস্কেও শাসনমতায় আছে।

দ্বিতীয়ত মিসর। ১৯২৩ সাল থেকে নতুন সংবিধান রচিত হলে দেশটিতে রাজকীয় প্রতিষ্ঠানের আওতায় বহুদলীয় উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতি চালু করা হয়। মিসরের মোহাম্মদ আলী পাশা ইউরোপীয় আধুনিকতা ও সেকুলার আদর্শকে নিজ দেশে বাস্তবায়ন করতে উদ্যোগ নেন। তিনি সেনাবাহিনীকে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করেন এবং বিরোধীদের নির্মমভাবে নির্মূল করেন। এরপর মোহাম্মদ আলীর দৌহিত্র ইসমাইল পাশার আমলে সেকুলারনীতি ও আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়া আরো জোরদার করা হয়। তিনি শত শত আধুনিক স্কুল স্থাপন করেন ও কায়রো নগরীকে একটি আধুনিক নগরীতে রূপান্তর করেন। মোহাম্মদ আলী ও ইসমাইল পাশার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা মিসরের জন্য মঙ্গল বয়ে আনেনি। অচিরেই দেশটি ঋণভারে জর্জরিত হয়ে পড়ে এবং এ সুবাদে ব্রিটিশরা দেশটিতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ পায়। ফলে মিসর কার্যত ব্রিটেনের কলোনিতে রূপান্তরিত হয়। মোহাম্মদ আলী পাশার পরে জামাল আবদুন নাসের সেকুলার মতবাদের পক্ষে কঠোর নীতি গ্রহণ করেন। তারা মিসরীয় আলেমদের প্রভাব ও কর্তৃত্ব খর্ব করার চেষ্টা করেন। হাজার হাজার আলেম ও মুসলিম ব্রাদারহুড নেতাকর্মীকে কারাগারে নিপে ও নানা প্রকার অত্যাচার নির্যাতন চালায় সরকার। মিসরে ১৯২২ সালে ওয়াফদ পার্টি সেকুলারিজমের ধারণা নিয়ে রাজনীতি শুরু করে। ১৯২৮ সালে হাসানুল বান্নার নেতৃত্বে গঠিত হয় মুসলিম ব্রাদারহুড। প্রতিভাবান এ যুবকের নেতৃত্বে দলটি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে।

১৯২৩ থেকে ১৯৫২ সালের মধ্যে মিসরে রাজনৈতিক েেত্র উন্নত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সূচনা হয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ আধিপত্য, বৈদেশিক ও রাজপ্রাসাদের হস্তেেপ গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়। ১৯৫২ সালে সামরিক অভ্যুত্থান হলে বহুদলীয় গণতন্ত্র বাতিল হয়। ১৯৫৩ সালে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় ব্যবস্থা চালু করা হয়। ১৯৭৭ সালে দেশটি আবার বহুদলীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করে। তবে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠন করার সুযোগ রাখা হয়নি। যদিও সংবিধান অনুযায়ী আইনের অন্যতম উৎস হিসেবে কুরআন ও সুন্নাহকে মেনে নেয়া হয়েছিল।

প্রেসিডেন্ট জামাল নাসের মতা দখল করে সেকুলার নীতি অনুসরণ করেন। ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে ১৯৫৪ সালে প্রেসিডেন্ট নাসের ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ব্রাদারহুডের হাজার হাজার কর্মীকে জেল দেয়া হয়। একপর্যায়ে তাদের নেতা বিশ্বখ্যাত ইসলামি পণ্ডিত সাইয়েদ কুতুব ও আবদুল কাদের আওদাহসহ ছয় জনকে ফাঁসি দেয়া হয়। সাইয়েদ কুতুবের বোন জয়নব গাজ্জালীকে কারাগারে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। ১৯৭০ সালে নাসেরের মৃত্যু হলে তার উত্তরসূরি প্রেসিডেন্ট হন আনোয়ার সা’দাত। ইসরাইলের সাথে শান্তি চুক্তির পর আততায়ীর হাতে নিহত হলে ১৯৮১ সালে হোসনী মোবারক মতায় আসেন। তিনি সা’দাতের মৃত্যুর জন্য মিসরের ইসলামি দল ব্রাদারহুডকে দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে দমননীতি চালান। ব্রাদারহুডের হাজার হাজার নেতাকর্মী গ্রেফতার ও নির্যাতনের শিকার হন। দলটির নেতাকর্মীরা যাতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারেন সে জন্য বিভিন্ন বাধা সৃষ্টি করা হয়।

ব্রাদারহুড ২০০৫ সালে ‘ইসলামই সমাধান’       স্লোগান নিয়ে মিসরের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ৮৮টি আসন লাভ করে। তাদের জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে মতাসীন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি সরকার ব্রাদারহুডের ওপর গ্রেফতার, নির্যাতন ও হয়রানির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তাদের ব্যবসায়-বাণিজ্য বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি অনেক নেতাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা করে।

২০০৫ সালে সংবিধান সংশোধন করে জনগণের সরাসরি ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। ২০০৭ সালের আরেক সংশোধনীর মাধ্যমে বিধান করা হয়, ধর্ম, লিঙ্গ বা জাতিগোষ্ঠীর ভিত্তিতে কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করা যাবে না। এর মানে হচ্ছে রাজনৈতিক দলকে হতে হবে সেকুলার। মুসলিম ব্রাদারহুড দলের প্রার্থী যাতে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতে না পারেন সে জন্যই এসব কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। ২০০৫ সালের নির্বাচনী ফলাফলে দেখা যায়, সেকুলার দলগুলো গণতন্ত্রায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। অপর দিকে মুসলিম ব্রাদারহুড পার্লামেন্টের বাইরে সরকারবিরোধী ভূমিকা জোরদার করতে সম হয়। ২০১১ সালে আরব বসন্তের মাধ্যমে মিসরের স্বৈরশাসক হোসনী মোবারকের পতন ঘটে এবং পরে পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি জয়লাভ করে। সম্প্রতি মুসলিম ব্রাদারহুড ও অন্য ইসলামি দলগুলোর নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্টে সংবিধান প্রণীত হলে বাম ও সেকুলার দলগুলো প্রস্তাবিত সংবিধান ও প্রেসিডেন্টবিরোধী আন্দোলন শুরু করে।

এবারে বাংলাদেশের ইতিহাসের ওপর নজর দেয়া যাক। ১৯৭১ সালে নয় মাসের রক্তয়ী মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ ও বেশির ভাগ বাম দল দাবি করে, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ে সেকুলারিজমের জয় হয়েছে। ১৯৭২ সালে সংবিধানে সেকুলার ও সমাজতান্ত্রিক মতবাদকে রাষ্ট্রীয় মৌলিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং ধর্মভিত্তিক দল নিষিদ্ধ করা হয়। এর পরও সংবিধানটি বৈশিষ্ট্যগতভাবে ছিল বেশ গণতান্ত্রিক।

বিস্ময়কর বিষয় হলো যে শেখ মুজিব গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন তার নেতৃত্বে ১৯৭৫ সালে গণতান্ত্রিক সংবিধানকে আমূল পরিবর্তন করে একদলীয় স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। শেখ মুজিবের আমলে ইসলামি মূল্যবোধ নানাভাবে পর্যুদস্ত হয়। রাষ্ট্রের সর্বত্র সেকুলার নীতি প্রাধান্য পায়। এ সময় সোভিয়েত ইউনিয়নপন্থী বামদলগুলো আওয়ামী লীগের সাথে গাঁটছড়া বাঁধে। চীনপন্থী বামদলগুলো অবশ্য দূরত্বে অবস্থান করে।

এরপর আসে সামরিক শাসন। জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃ প্রবর্তন করা হয়। তিনি সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে পরিবর্তন আনেন এবং সেকুলারিজমের পরিবর্তে ‘আল্লাহর ওপর অবিচল বিশ্বাস ও আস্থা’ প্রতিস্থাপন করেন। তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় মূল্যবোধকে উজ্জীবিত করেন ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করেন। এ সময় ইসলামি দলগুলো রাজনীতিতে পুনরুজ্জীবিত হয়। ১৯৮২ সালে গণতান্ত্রিক সরকারকে অস্ত্রের মুখে হটিয়ে দিয়ে জেনারেল এরশাদ সামরিক শাসন জারি করেন। এরশাদ সংবিধানের ইসলামি চেতনাকে বহাল রাখেন এবং তিনি একধাপ এগিয়ে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৯৯০ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল এরশাদের পতন ঘটে। তার বিরুদ্ধে পরিচালিত গণ-আন্দোলনে আওয়ামী লীগ, জাতীয়তাবাদী দল, বাম ও ইসলামপন্থী দলগুলো অংশ নেয়। একটি স্বচ্ছ নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জয়লাভ করে। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে পার্লামেন্টে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ, বামদল ও জামায়াতে ইসলামীর সম্মিলিত আন্দোলনে সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংযোজন হয়। পরবর্তী নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ২০০১ সালের নির্বাচনে তার দলের পরাজয় ঘটে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ আবার মতায় আসে। এবারে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানে ব্যাপক সংশোধনী আনে এবং যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার জন্য তিনি সংগ্রাম করেছিলেন তা বাতিল করা হয়। তার পিতার প্রবর্তিত সেকুলারিজম সংবিধানে পুনঃসংযোজন করা হয় এবং জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ‘আল্লাহর ওপর অবিচল বিশ্বাস ও আস্থা’ বাতিল করা হয়। তবে সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাখা হয়। সংশোধিত সংবিধানে ধর্মীয় দল নিষিদ্ধ করা হবে বলে জল্পনা-কল্পনা থাকলেও তা করা হয়নি। তবে সংবিধানে যাই থাক না কেন, ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলো চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর ওপর দমনপীড়ন চলছে। তাদের হাজার হাজার নেতাকর্মী কারাগারে নিপ্তি হয়েছে। প্রতিপরে হাতে হত্যা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটে চলেছে অনেক। বিরোধী দলের বহু লোক গুম হয়ে গেছে বলে পত্রিকায় প্রকাশ। সাংবাদিকেরা স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চেয়ে আন্দোলনে নেমেছেন। ইসলামপন্থীরা কোনো মিছিল সভা-সমাবেশ করতে পারছে না। এমনকি তাফসির মাহফিলের মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও বাধা দেয়া হচ্ছে। কারো কাছে ইসলামি বই পাওয়া গেলে তাকে জঙ্গি বই বলে প্রচার করা হচ্ছে। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি ছাত্র সংগঠনগুলো প্রকাশ্যে কোনো কার্যক্রম চালাতে পারে না। ইসলামপন্থী ছাত্রীদেরও বিনা কারণে কারাগারে নিপে করা হয়েছে। শিাব্যবস্থাকে সেকুলার রূপ দেয়ার কাজ নীরবেই অনেকটা সম্পন্ন হয়ে গেছে। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সেকুলারিজম ও ভারতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন তীব্র হয়েছে। দেশের সব রাষ্ট্রীয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে চরম মাত্রায় দলীয়করণ করা হয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে নাজুক অবস্থা মোকাবেলা করছে। আইনের শাসন হয়ে পড়েছে প্রশ্নবিদ্ধ।

দেশের ধর্মীয় ও সম্প্রদায়ভিত্তিক দল বিশেষত জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানাচ্ছে বামপন্থী কয়েকটি দল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, জামায়াত একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এবং সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এ কারণে তাদের নিষিদ্ধ করা সংবিধানসম্মত হবে না। বিশ্বায়নের এ যুগে কোনো গণতান্ত্রিক দলকে নিষিদ্ধ করা বাস্তবসম্মতও নয়। আজ তাদের নিষিদ্ধ করা হলে কাল তারা নতুন দল গঠন করতে পারে। তা ছাড়া মজলুম মানুষের প্রতি জনগণের সহানুভূতি বৃদ্ধি পায়, যেমনটি ঘটেছে তুরস্ক ও মিসরে। তুরস্কের জনগণ এখন ইসলামি দল একে পার্টিকে এবং মিসরের জনগণ মুসলিম ব্রাদারহুডকে ব্যাপক হারে ভোট দিচ্ছেন।

তুরস্ক ও মিসরের মতোই বাংলাদেশে সেকুলার ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির যাত্রা এবং পরে সামরিক ও স্বৈরশাসনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তুরস্ক ও মিসরের স্বৈরশাসকেরা সেকুলার হলেও জনগণের ঘৃণা এড়ানোর জন্য ইসলামের নাম একেবারে বাদ দেননি। বাংলাদেশে সেকুলার শাসকেরাও তাই করছেন। আবার ওই দুটো দেশের মতোই বাংলাদেশে চলছে ইসলামপন্থীদের ওপর নির্যাতন। এক সময় বাংলাদেশেও যদি তুরস্ক ও মিসরের মতো ঘটনা ঘটে তাহলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না।

লেখক: মিয়া মুহাম্মদ আইয়ুব

শেয়ার করুন