জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দেবে: সিপিডি

0
193
Print Friendly, PDF & Email

             ঢাকা ( ৫জানুয়ারী) : জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাতে পারে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন এই বেসরকারি গবেষণা সংস্থার গবেষকরা।

শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডিস্থ সিপিডি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার পক্ষে এসব অভিমত তুলে ধরেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যসহ অন্যরা।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি সম্পর্কে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বিশ্ব বাজারে জ্বালানি যখন তেলের দাম অনেকটাই স্থিতিশীল। ঠিক তেমন একটি সময়ে তেলের দাম বাড়ানো হলো। এতে করে খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বাড়বে। বলতে গেলে, এটি পুরো মূল্যস্ফীতি প্রক্রিয়াকে উস্কে দেবে। যার আঘাত গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের উপর।”
    
এর মোকাবেলায় সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “কৃষকের জন্য বরাদ্দকৃত ভর্তুকি সমন্বয় করতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সুবিধার আওতা বাড়াতে হবে।”

পাশাপাশি ২০১২-১৩ অর্থ বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৩ থেকে ৬ দশমিক ৪ এর বেশি হবে না বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন তারা।

সংস্থার মতে, ‘সরকার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে প্রবৃদ্ধির সাথে সমঝোতা করেছে। ফলে কোনোভাবেই বাজেটে ঘোষিত ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সম্ভব হবে না। আর ষষ্ঠ পঞ্চ বার্ষিকীর ঘোষণা অনুযায়ী ৭ দশমিক ৯ শতাংশ তো কোন ভাবেই সম্ভব নয়।’ একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকেও উস্কে দেওয়ার পাশাপাশি পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

চলতি অর্থ বছরে অর্থনীতির ঝুঁকি সম্পর্কে বলতে গিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের অধিক পরিমাণ ঋণ গ্রহণ, বৈদেশিক সাহায্য হ্রাস পাওয়া, বিশ্ব মন্দা, মূল্যস্ফীতিসহ বেশ কিছু অনিশ্চয়তা আর ঝুঁকির মধ্যে দিয়ে আমরা ২০১২-১৩ অর্থ বছর শুরু করেছিলাম। গত অর্থ বছরে আমরা দেখেছি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রবৃদ্ধিকে ছাড় দিতে হয়েছে। আমাদের দেশের মতো অর্থনীতির দেশে এটি জরুরি। কিন্তু এখন দেখবার বিষয়, এ বছর বাংলাদেশ ব্যাংক কি পদক্ষেপ নেয়। প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতিকে কীভাবে সমন্বয় করে।”

তিনি বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, সরকার অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য প্রবৃদ্ধির সাথে সমঝোতা করছে। ফলে কোন ভাবেই প্রবৃদ্ধি গত বছরের থেকে বেশি হওয়া সম্ভব নয়।”

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে কী না এ সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “চলতি বছর জাতীয় রাজস্ব বোডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো জাতীয় প্রবৃদ্ধি ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ। কিন্তু গত ৫ মাস ধরে তা হয়েছে ১৫ দশমিক ১ শতাংশ। ফলে আগামী ৭ মাসে তা ২১ থেকে ২২ শতাংশ হতে হবে। যা অনেকটাই কঠিন। এর মধ্যে আরো ৮ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো এনবিআর কীভাবে তা সম্ভব করতে পারবে”।

সরকারের আয় থেকে বেশি ব্যয় সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে সিপিডি জানায় চলতি অর্থ বছরের প্রথম ৫ মাসে সরকারের আয়ের প্রবৃদ্ধির থেকে ব্যয় অধিক মাত্রায় বেড়েছে।

সিপিডির প্রাপ্ত তথ্য মতে, বাজেটে ব্যয় বৃদ্ধির হার রাখা হয়েছে ১৩ শতাংশ। কিন্তু বর্তমানে তা ১৮ শতাংশ। এর মধ্যে আবার ১০ দশমিক ৪ শতাংশ চলে যাচ্ছে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের গৃহীত ঋণের সুদ হিসেবে। মূলত গত কয়েক বছরের গৃহীত ঋণের কুফল এটি। এর প্রভাব অর্থ বছরের দ্বিতীয় মেয়াদে আরো বাড়বে বলে সিপিডির পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

অর্থবছরের বাকিটা সময় ব্যাংক ঋণ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াবে উল্লেখ করে সিপিডি জানায় চলতি অর্থ বছরে সরকারের ব্যাংক ঋণ বাজেটে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে যাবে। সংস্থার গবেষকদের মতে, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নেওয়া ঋণ ৩৩ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া আরও অতিরিক্ত ১০ হাজার কোটি টাকা ধার করতে হবে। কারণ, সরকার যে পরিমাণ বৈদেশিক অর্থ আশা করেছিলো তা পাবে না।

ড. মোস্তাফিজ বলেন, “বাজেটে ১২ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক সাহায্য ধরা হয়েছে। কিন্তু অর্থ ছাড় সামান্য বাড়লেও তা যে ধারায় রয়েছে তা সাত হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে।”

অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে সমন্বয়ের তাগিদ দিয়ে সিপিডি বলেছে আর্থিক খাতে শৃংখলা সুসংহত করতে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে আরো বেশি সমন্বয় করতে হবে।

একই সঙ্গে হলমার্ক কেলেংকারির পর ব্যাংকিং খাতের ওপর মানুষের আস্থা কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায় তার জন্যও কাজ করতে হবে বলে বলে উল্লেখ করে সিপিডি। সিপিডির মতে, ঋণের গুণগত মান নিশ্চিত করার কথা বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু অর্থ বছরের বাকি সময়টাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেটি কিভাবে নিশ্চিত করে করে তাই দেখার বিষয়।

দেশের বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সিপিডি বলছে, ‘উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য যে পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার, বর্তমানে সে পরিমাণে বিনিয়োগ নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি সংকোচনমূলক। পরিস্থিতি অনুযায়ী দেশে বিনিয়োগ হতে হবে জিডিপির ২৯ শতাংশ। কিন্তু তথ্য মতে, তার অনেক পেছনে রয়েছি আমরা। আবার উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, যা একটি অশুভ সংকেত।’

ড. মোস্তাফিজুর রহমান এ সবের বাইরে আমদানি রপ্তানি, মূল্যস্ফীতি, রেমিটেন্স প্রবাহ, উৎপাদন খাত, কৃষি খাত, টাকার অবমূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের অর্থ ছাড় ও এর শর্তাবলী এবং আর্থিক খাতের সুশাসনে করনীয়সহ অর্থনীতির নানা সূচক নিয়ে উদ্বেগ উৎকন্ঠা প্রকাশের পাশাপাশি পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের করনীয় কী হতে পারে তা তুলে ধরেন।

নিউজরুম

শেয়ার করুন