এক হতভাগী মা বিশ হাজার টাকায় বিক্রি করলেন তার সন্তান !

0
212
Print Friendly, PDF & Email

চুয়াডাঙ্গা ( ৪জানুয়ারী) : একদিকে নিত্য অভাব-অনটনের বোঝা আর ক্ষুধার তাড়না অন্যদিকে নিজের চিকিৎসার জন্য শেষ পর্যন্ত মাত্র বিশ হাজার টাকায় নিজের বুকের ধন একমাত্র সন্তানকে বিক্রি করে দিলেন এক হতভাগী মা।

গত ১ জানুয়ারি চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমযাঙ্গাতে নোটারী পাবলিকের সাধ্যমে দু’মাসের শিশু আকাশকে বিশ হাজার টাকায় বিক্রির এ ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি এ ঘটনা জানতে পান এ প্রতিবেদক।

এ বছরের সমাজের নানা বঞ্চনা ও প্রতারণার শিকার এই হতভাগী মা বিউটি । নেই মাথা গোঁজার মত ঠাঁই । নিজের চিকিৎসার জন্য শেষমেষ তাই বাধ্য হয়ে তার শেষ সম্বল একমাত্র সন্তান আকাশকে বিক্রি করে দিতে হল!

এক সময় আর দশটা নারীর মত বিউটিরও স্বামী সন্তান নিয়ে সাজানো একটি সুখের সংসার ছিল। কিন্তু এখন তার আর কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই। সবকিছু হারিয়ে নিজের নাড়ী ছেড়া শেষ অবলম্বন সন্তানকেও শেষ পর্যন্ত হারালেন তিনি।

পাকাপোক্তভাবে দালিলিত প্রমাণপত্রের মাধ্যমে বিউটি মাত্র হাজার টাকার বিনিময়ে তার ছেলে আকাশকে বিক্রি করে দিয়েছেন।

বিউটিকে এখন থেকে আর কোনো মধুর কণ্ঠের মা ডাক মুগ্ধ করবে না। সে আর দিতে পারবেনা মাতৃত্বের পরিচয়।  দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধরে যাকে লালন পালন করে বড় করছিলেন সে সন্তানের সাথে তার যোজন যোজন দূরত্ব তৈরী করে দিয়েছে বিশ হাজার টাকা।

ভাগ্যের এমনই নির্মম পরিহাস, বিক্রয়ের পরপরই বিউটির সবরকমের স্মৃতি মুছে ফেলতে আকাশের দালিলিক  পিতা আকাশের নতুন নাম রেখেছেন মাহিদ হাসান। এ নামেই আকাশকে বড় হতে হবে। কোনদিন সে জানবেও না  আকাশ নামের কেউ ছিল । জানবে না বিউটি বলে কোন হতভাগী কোনো গর্ভধারিনী তার মা।

এদিকে, আকাশের দালিলিক পিতা আব্দুল আলমি ওরফে কর্নেল বিউটির কাছ থেকে আকাশকে কিনে চুয়াডাঙ্গা শহর থেখে ৩৫কিমি দুরে চুয়াডাঙ্গার পার্শ্ববর্তী কুষ্টিয়া জেলা সদরের ইবি থানার শংকরদিয়া গ্রামে নিজ বাড়িতে নিয়ে রেখেছেন।

সেখানে দু’মাস বয়সী এই শিশুটিকে পরম যত্নে লালন পালন করছেন আকাশের নতুন মা ও নানী। আকাশের খোঁজে কেউ গেলে কোনভাবেই তাকে দেখতে দিতে চান না তারা।

এই প্রতিবেদক আকাশের খোঁজে শংকরদিয়া গেলে নিজের পরিচয় গোপন রেখে আকাশকে দেখে আসেন। সেখানে শিশুটির কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

অপরদিকে আকাশের হতভাগী মা বিউটির খোঁজ নিতে গিয়ে এ প্রতিবেদক পান  সমাজ অবক্ষয়ের ভয়াবহ চিত্র। বিউটি চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা থানার হাড়োকান্দী গ্রামে তার সৎ খালু মহনের বাড়ীতে থাকে।  

মহন হাড়কান্দি বাজারের চা বিক্রেতা। তার মাধ্যমেই আকাশ বিক্রি হয়েছে। বিউটির কথা জানতে চাইলে সে জানায়, এতোদিন কেউ বিউটির খোঁজ না নিলেও সন্তান বিক্রি করে টাকা পাওয়ার সংবাদ শোনার পর বিউটির ভাই ও আত্মীয় স্বজনরা বিউটিকে নিয়ে টানা হেঁচড়া শুরু করছে।

বিউটির অতীত জানতে গিয়ে পাওয়া গেল আরও করুণ এক অধ্যায়। চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা থানার অজপাড়া গ‍া বুড়োপাড়া গ্রাম। এই গ্রামের হত দরিদ্র আমিরুলের একমাত্র কন্যা সন্তান বিউটি। বিউটির একমাত্র ভাই শান্তি।

ছোট বেলায় দেখতে খুব সুন্দর হওয়ায় বিউটির মা কদবানু সখ করে নাম রাখে বিউটি। বিউটি বুড়োপাড়া গ্রামের স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময়ই মাত্র ১৩ বছর বয়সে আলমডাঙ্গা থানার নাগদহ গ্রামের মোকাম আলীর ছেলে সুদর্সণ আসিফের সাথে সুন্দরী বিউটির বিয়ে হয়। বিয়ের পর পরই বিউটির কোল জুড়ে আসে একটি পুত্র সন্তান।

সন্তান প্রসবের পর বিউটি অযত্নে অবহেলায় নানান রোগে আক্রান্ত হতে থাকে । হারিয়ে যায় তার রুপ লাবণ্য। বিনা চিকিৎসার  কারণে এক সময় শারীরিক অক্ষমতা দেখা দেয় তার। এসব কারণে বিউটির স্বামী সাইফ গোপনে বিউটিকে ১৫ হাজার টাকার দেন মোহরানা কোর্টে দিয়ে  বিউটিকে তালাক দেয়। এক যুগের সংসার থেকে প্রতারিত হয়ে বিতাড়িত হয় বিউটি।

বাবার  বাড়ি এসে অকুল পাথারে পড়ে যায় সে। এর মধ্যে তার  মা মারা গেলে বাবা নতুন বিয়ে করে। সৎমার অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে বিউটি দ্বিতীয় বিয়ে করে ঝিনাইদহ জেলার ত্রিমহনী গ্রামের টেনুর সঙ্গে।

কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতে বিউটির গর্ভবতী হবার কিছুদিন পরেই তার স্বামী টেনু নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন স্বামীর খোঁজ না পেয়ে বিউটি তার দু’মাসের ছেলেকে নিয়ে আশ্রয় চাইলে কেউ তাকে একটু মাথা গোঁজার ঠাই দেয়নি। নিজের জীবনের নানান সমস্যার মাঝে বিউটি কোন কুল কিনারা না পেয়ে সিদ্ধান্ত নেয় তার এক মাত্র সন্তানকে বিক্রি করে দেবার।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে,  সন্তান বিক্রির কোন দলিল হয়নি।  সন্তান বিক্রির বিষয়টি বিউটি সরাসরি স্বীকার না করলেও ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে আকাশের দত্তক দলিল সম্পন্ন হয়েছে এর প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে।

এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলা বারের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ্যাড: মানি খন্দকার জানান, যদিও মুসলিম আইনে কোন দত্তক দেওয়ার কোন দালিলিক নিয়ম নেই । তার পরেও চুয়াডাঙ্গা নোটারী পাবলিকের মাধ্যমে গত ১লা জানুয়ারি ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে আকাশকে বিক্রি করে দিয়েছে বিউটি। নোটারীতে উল্লেখ আছে বিউটি কোন দিন আর আকাশের পরিচয় দেবেনা এমনকি দেখতেও যেতে পারবেনা। এবং বিক্রির বিষয়টিও উহ্য রাখা হয়েছে।

তবে উকিল বলেছেন মানবিক কারণে আকাশের দালিলিক পিতা কর্নেল ইচ্ছা করলে  দেখাশোনার সুযোগ দিতে পারেন বলে  জানান  তিনি। অভাব আর কষ্ট সহ্য করতে না পেরে শিশ সন্তানকে বিক্রি করে দিয়ে বিউটি এখন শোকে পাথর হয়ে গেছে।

নিউজরুম

শেয়ার করুন