আশা নাজনীন-এর গল্প নির্যাতিত পুরুষের অন্দরমহল থেকে

0
120
Print Friendly, PDF & Email

কায়েস দেওয়ান বিয়ে করেছে মাত্র তিনমাস। এই তিনমাসে সে কম করে হলেও তেরোটি ধাক্কা খেয়েছেন বৈবাহিক সূত্রে।
এসব না যায় কাউকে বলা, না যায় সহ্য করা।
বিয়ের পর নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে সে আবিষ্কার করলো যে স্ত্রীর চেয়ে তিনি কিঞ্চিত পরিমাণে খাটো।
সত্যি সত্যি যে খাটো তা নয়, শাড়ির সঙ্গে স্ত্রী হিল পড়েছে। আর এতে করে পুরুষ হিসেবে তিনি যে চোখে পড়ার মতো লম্বা নন, তা এখন পুরোই চোখে লাগছে।
‘আরে তুই দেখি বিয়ের পরে লম্বা হয়ে গেছিস শম্পা!’
এভাবেই স্ত্রীর বান্ধবী কায়েস দেওয়ানের প্রতি ইঙ্গিতসুলভ অপমান ছুড়ে দিলেন।
কায়েস দেওয়ান তার নামের সঙ্গে যে ক্ষমতাধর একটা শব্দ পৈত্রিকসূত্রে পেয়েছেন, তা অধিকাংশ সময়ে কাজে লাগে না। এখনো লাগেনি। দেওয়ান নামের অধিকারি হয়েও বিন্দুমাত্র সম্মান তিনি পাচ্ছেন না স্ত্রী’র বান্ধবীদের কাছ থেকে। বিশ্বের কতো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা তার চেয়েও লম্বায় ছোটো, কই সেটা নিয়ে তো কেউ এভাবে মুখরা হয়ে উঠছে না— কেবল কায়েস দেওয়ানের বেলাতেই যতো দোষ।

বাসায় ফিরে স্ত্রী শম্পাকে কাচুমাচু করে বললো— দেখো, তুমি তো এমনিতেই লম্বা, খালি খালি এসব হিল-টিল পড়ার দরকার আছে?
ওমনি নতুন স্ত্রী ১০ বছরের পুরনো স্ত্রীর মতো কর্কশ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলেন— তুমি চাও আমাকে যেনো আরো মোটা লাগে? হিল পরলে আমাকে যা একটু স্মার্ট এবং স্লিম মনে হয় তুমি সেটাও সহ্য করতে পারছো না? বিয়ের পরের দিনই আমি বুঝেছি তুমি আমাকে ভীষণ হিংসা করো। নিজেকে অতো ছোটো ভাবো কেন-হ্যা? আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়েছি, আর তুমি ঢাকা কলেজ থেকে, তাই? এতে এতো ইনফেরিয়রিটিতে ভোগার কী আছে? তুমি একটা ভালো ব্যাংকে চাকরি করছো তাইনা? তারপরেও তোমার সমস্যা কোথায়?
কায়েস দেওয়ান নববধূর দুহাত চেপে ধরে বললো— থামো প্লিজ!
আরে থামবো কেন, তুমি হীনমন্যতায় ভুগছো, এটার সমাধান করতে হবে, এগুলো সংসার জীবনে অনেক অশান্তি তৈরি করে…
কায়েস দেওয়ান দেখলো স্ত্রীর গলা ক্রমান্বয়ে উঁচুতে উঠছে, বাড়িসুদ্ধ লোক টের পেয়ে যাচ্ছে এই আশঙ্কায় স্ত্রী’র হাঁটু চেপে ধরলেন।
‘আমাকে ক্ষমা করো.. আমি ভুল করেছি… আর কোনোদিনও এমন হবে না।’
স্ত্রী আপাতত থামলো। কিন্তু অভিমান করার মতো মুখ করে উল্টো দিকে ফিরে শুয়ে আছে।

কায়েস ভাবছে, কী দোষ করলাম আমি, সামান্য একটা হিল নিয়ে কথা তোলাতে এতো কথা শুনতে হলো। ভাগ্যিস, আর কোনো কিছু নিয়ে সে কথা তোলেনি! তবুও একটা বিষয় নিয়ে তিনি না ভেবে পারছেন না— এই যে স্ত্রী কথায় কথায় তাকে ইনফেরিয়রিটিতে ভোগার খোটা দিচ্ছেন… এটা তো ঠিক নয়, ঢাকা কলেজে পড়েই সে তো একটা নামী-দামী ব্যাংকের বড় পদে কাজ করছে। আর স্ত্রী ঢাকা বিশ্বাবদ্যালয়ে নাম কস্তে পড়েছে ঠিকই, কিন্তু করছে টা কী? বিয়ের আগে পারিবারিক আয়োজনে যখন তাদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়, তখনই কায়েস জিজ্ঞেস করেছিলো, চাকরি বাকরি কিছু করছেন না কেন? পাস করেছেন তো বছর খানেক হলো।
হবু স্ত্রী শম্পা তখন ভ্রূ কুঁচকে বলেছিলো— চাকরি বাকরি আমার ভালো লাগে না।
কথাটা তার পছন্দ না হলেও কায়েস দেওয়ানের মা’র ভীষণ পছন্দ হয়েছে। কিন্তু কায়েসের ধারণা, যে বিষয়ে স্ত্রী পড়েছেন, সে বিষয়ে পাস করে চাকরি পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়— যতো বড় বিশ্ববিদ্যালয়েরই সিল থাকুক না কোন। চাকরি পাচ্ছে না, সেকথা স্বীকার না  করে একটা ভাব দেখালো আর কি!

কয়েক দিন যেতে না যেতেই কায়েসের ধারণাটা সত্যি প্রমাণিত হলো। কায়েসের ব্যাংকের একটা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাপা হলো।
শম্পা বললো— পত্রিকায় যে বিজ্ঞাপনটা ছাপা হয়েছে, এটা আমার কেন যেন পছন্দ হয়েছে। আমি আবেদন করবো। কী বলো?
কায়েস চমকে উঠে বললো— তুমি না বলেছিলে..চাকরি করতে ভালো লাগে না…
আরে সেটা তো বিয়ের আগের কথা.. সে সময় যা ভেবেছিলাম, এখন তার কতো কিছুই তো পাল্টে গেছে। ভেবেছিলাম, বিয়ের পরে স্বামীর গাড়িতে করে সারা শহর ঘুরবো, ইচ্ছেমতো শাড়ি-গহনা কিনবো.. সেসব তো কিছুই হচ্ছে না। এখন মনে হলো নিজের একটা আয়ের ব্যবস্থা করতেই হবে। তোমার কাড়ি কাড়ি টাকা থাকলে হয়তো এটা ভাবতাম না। এখন বলো, আবেদন করবো কি না?

তোমার যদি ইচ্ছে হয়, তাহলে আমি বাধা দেবো কেনো?
ওরকম দায়সারা উত্তর দিচ্ছো কেনো? চাকুরি দেবে কি না সেটা বলো..

আরে আমি চাকুর দেবো কিভাবে.. আমি তো ম্যানেজার নই, ওটা তো অনেক বড় কর্তাদের ব্যাপার…
কায়েস ভ্রূ কুঁচকে মিনমিন করে বলতে থাকে।

চাকুরিতো বড় কর্তারাই দিবে কিন্তু তুমি লবিং করতে পারবে কি না বলো.. শম্পার স্পষ্ট প্রশ্ন।

কায়েস আমতা আমতা করে বলে, দেখো লবিংয়ের অভ্যাস আমার কোনদিনও ছিলো না, এখনও নেই..এটা সম্ভব নয়।

সম্ভব নয়, নাকি কেউ তোমাকে দুপয়সা দাম দেয়না? শম্পার সুক্ষ্ম খোঁচা কায়েস আর সহ্য করতে পারলো না, মাথা ঝাঁকিয়ে চোখ বড় বড় করে বললো— হ্যাঁ হ্যাঁ সত্যিই আমাকে কেউ দাম দেয় না, এবার হলো?

পুরো একদিন কথা না বলে থেকেছে শম্পা। কায়েসেরও ভীষণ অপমানে লেগেছে। সেও কথা বলেনি।
কিন্তু কতো আর রাগ করে থাকা যায়। রাতের বেলা যেই একটু স্ত্রীর কাছে ঘেষেছেন, কায়েসের দুর্বলতা টের পেয়ে আবারো সে একচোট দেখে নিলো। বললো— তুমি হিংসে করে এরকম করছো, তুমি জানো ওই অফিসে একবার ঢুকলে দুদিনেই পদোন্নাতি পেয়ে আমি তোমার বস হবো, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ে পড়েছি, সবাই আমাকে বাহবা দিবো, তাই আমার জন্য সামান্য একটু তদবিরও করতে পারবে না, তোমাকে তো মন্ত্রী আমলা ধরতে বলিনি, নিজের অফিসের লোকদের একটু বলবে, সেটাই যদি না পারো, তবে তোমার মতো নামমাত্র দেওয়ানের ঘর করে আমার কী লাভ…
কায়েসও আর মাথা ঠিক রাখতে পারলো না। পাল্টা জবাব দিয়ে বললো— নামমাত্র দেওয়ান বলেই তো, তোমার মতো মহিলাকে নিয়ে ঘর করতে হচ্ছে, সত্যিকারের দেওয়ানই যদি হতাম তবে বহু স্মার্ট, সুন্দরীর সাথে রাতযাপন করতাম, নর্তকী নেচে গেয়ে আমাকে রাতের বেলায় শান্তি দিতো।

চেঁচিয়ে যেনো শোবার ঘরের দেয়াল ভেঙে ফেলবেন স্ত্রী… ও এই তাহলে তোমার মনে, এরকম বাজে স্বভাবের পুরুষের সাথে আমার জুড়ি লেখা ছিলো, হায় আল্লাহ জীবনে কী পাপ করেছিলেম, চরিত্রহীন স্বামীর ঘর করার চেয়ে আমার মৃত্যু ভালো…।

এর মধ্যে কায়েসের ৬৬ বছর বয়স্ক মা দরজায় টোকা দিতে লাগলেন… কিরে কী হলো.. কোনো সমস্যা…?
না মা.. বলে কায়েস স্ত্রীর মুখ চেপে ধরলেন। মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন, যেনো আবোল-তাবোল বলা বন্ধ হয়।

স্ত্রীও থামলো, দরজায়ও আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। স্ত্রী’র মুখ থেকে আলতো করে হাত সরিয়ে নিয়ে কায়েস বললেন— তুমি অযথাই আমাকে দোষী করছো, তোমার চাকরির একটা ব্যবস্থা যে করেই হোক আমি করবো, আমার অফিসে যদি না হয়, অন্য কোনো জায়গায় হলেও ব্যবস্থা করবো, ঘুষও দিবো, তবু তুমি শান্ত থাকো..।

-এখন তো চাকরি নয়, সোনার হরিণও তুমি আমাকে দিতে চাইবে, তোমার চরিত্র আমার কাছে উন্মোচন হয়ে গেছে।
:আবার বাজে বকছো চরিত্র নিয়ে কথা বলবে না, বলছি..।
-না তা করবো কেন, চরিত্র নিয়ে কথা বললেই তো মুখ চেপে ধরবে.. কালই আমি বাসা ছাড়বো।

সারারাত ভয়ে কায়েস আর কোনো টু-শব্দ করেনি।

কায়েস নিজের ইজ্জত রক্ষা করতে আবারো পরদিন সকালে অফিসে আসার আগে আরেক দফায় শম্পার পা চেপে ধরলো। সে আপাতত বাসা না ছাড়লেও হুমকি অব্যাহত রয়েছে। কায়েস বিকেলে বাসায় না ফিরে বড় ভাইয়ের বাসায় গেলো, বাড়ি ফিরে বউয়ের গোমড়া মুখ, মায়ের হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে সারা সন্ধ্যা যদি এখানে কাটিয়ে দেওয়া যায়, মন্দ কি! রাতে ঠিক ঘুমানোর আগে বাড়িতে ফিরবে বলে মনস্থির করলো।
বড় ভাইয়ের বাসায় ঢুকেই টের পেলেন উত্তপ্ত পরিস্তিতি। কাজের মেয়েটা দরজা খুলেই দৌড় দিয়ে চলে গেলো। কায়েস কিছুক্ষণ বসার ঘরে চুপচাপ বসে রইলেন। ভেতর থেকে ভাবীর গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
উঠে কি ভেতরে যাবে? না কেমন দেখায়, না গিয়ে একটু থামানো উচিত.. সব মিলিয়ে কায়েস বুঝতে পারছে না কী করবে… এমন সময় চার বছরের ভাতিজা শিমুল এসে কায়েসের গলা জড়িয়ে ধরলো। এই ভাতিজার জন্য কায়েসের সবসময়েই একটা আলাদা টান রয়েছে।

চাচ্চু তুমি কেমন আছো.. কায়েস জানতে চায়,
‘ভালো নেই আমি, বাসায় ভালো লাগে না’— শিমুল চুপটি করে বললো।
-কেন কি হয়েছে?
শিমুল চুপচাপ। কায়েসও চুপ। বুঝতে পারলেন, নিশ্চয়ই বাসার পরিববেশের কারণে মন খারাপ।
কায়েস এবার একধাপ এগিয়ে বললো, মন খারাপ করো না, চাচ্চু, এরকম সব বাসাতেই হয়।
সব আম্মুরা কি আব্বুদের গায়ে ফুলদানি ছুড়ে মারে?
কায়েসের কাছে এর কোনো জবাব নেই। কিন্তু কায়েস আঁৎকে ওঠে, সর্বনাশ দুদিন পরে শম্পা আবার আমার গায়ে ফুলদানি ছুড়ে মারবে না তো?

কায়েস আর শিশুলের কথা বেশিদূর এগোয় না।
ভাবীর পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।
আরে, কায়েস যে, কেমন আছো, ভালো সময়েই এসেছো, তোমার কাছে বিচার দেওয়া যাবে।
কায়েস একটু সহজ হলো, ভাবছিলেন ভাবী বোধহয় কায়েসকে দেখে ইতস্তত বোধ করবেন, ইতস্তত বোধ না করে উল্টো ভাবীকে মনে হলো দেবরকে দেখে বেশ উৎফুল্ল। ভাবীর মধ্যে ভনিতা ব্যাপারটি নেই, এই কারণে মায়ের সাথে যতোই চুলোচুলি থাকুক না কেন, ভাবীকে কায়েস খানিকটা পছন্দও করেন।

একমাসে তোমার বাস ভাড়া কতো লাগে তো বলো তো কায়েস? ভাবী হুড়মড়িয়ে জানতে চায়।
-ভাবী লোকাল বাসে নাকি সিটিং সার্ভিসে?
:আরে, দেশে কি আবার সিটিং সার্ভিস বলে কিছু আছে নাকি? ওখানেও তো রাজ্যের সব অফিসগামী লোকেরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অফিসে যায়, ঝুলে ঝুলে অফিস থেকে বাসায় ফিরে। লোকাল বাসে কতো লাগে বলো তো…

-ভাবী, লোকাল বাসেরটা তো জানিনা, ঠিক সঠিক বলতে পারবো না, আমি তো আসলে মেক্সিতে করে যাওয়া-আসা করি।
:তাহলে যাতায়াত খরচ নিয়ে তোমার সাথে আলাপ করে লাভ নেই।

অফিসে চা-পানি খাও? ভাবীর আরেক প্রশ্ন
-হ্যা, ভাবী খাইতো।
:কতো লাগে বলো তো, আনুমানিক।
-ভাবী আমাদের অফিসে চা-কফি ফ্রি, সারাদিন যে যতো পারে খায়, যার চা-পানির নেশা নেই, সেও খাওয়া শুরু করে, যে শুরু করে না সে পস্তায়.. আর কি… কায়েস একটু ঠাট্টার সুরে বললো।

ভাবী চিন্তিত হয়ে পড়লেন। ‘ও তার মানে এই…দাঁড়াও এরপরে এর একটা শায়েস্তা করতে হবে।’
কায়েস ভ্রূ কুঁচকে বললো— ভাবী ঠিক বুঝলামনা..

ও তুমি বুঝবে না কায়েস, তোমার মাথায় যে ঘিলু, তা দিয়ে তোমার ভাইকে চেনা তোমার পক্ষে সম্ভব নয়।
মাসের ২০ দিন না যেতেই তার পকেট খরচ শেষ হয়ে যায়, কিছু বললেই বলে আরে অফিসে কি চা-কফিও খেতে পারবো না, এখন তো আমার বুঝতে বাকি নেই, অফিসে ওসব ফ্রি খায়, কিন্তু আমাকে বলেনি…

-না না ভাবী, ভুল বুঝো না, সব অফিসে কিন্তু এই সুবিধা নেই।
:আরে তুমি চুপ করো, তোমার ভাইয়ের যদি চা কফি খাওয়ার এতো শখ থাকে তাহলে বাসায় এসে খায় না কেন? ওসব কিচ্ছু না, টাকা অন্য কোথায় উড়ায়.. সারাদিন আমি হাড়ভাঙা খাটুনি করি, বাচ্চাদেও স্কুলে আনা-নেওয়া করি, তোমার ভাইয়ের তো এসব গায়ে লাগে না, পাই পাই হিসাব না পাওয়া পর্যন্ত এক টাকাও এ মাসে আমি আর দিবো না।

ভাবী উঠে দাড়ালেন, এই.. কায়েসকে চা-নাস্তা দে.. কাজের মেয়েকে ডাকতে ডাকতে রান্না ঘরের দিকে গেলেন।

বড় ভাই এসেই কায়েসের কোলে বসা শিমুলকে ওর ঘরে পাঠিয়ে দিলেন।
:কি রে মা কেমন আছে? গত পরশু একবার কথা হয়েছিলো, আর কথা হয়নি।
-ভালো আছে ভাইয়্যা, তুমি চিন্তা করো না..
:তোর ভাবী কী বললো.. তোর কাছে এতোক্ষণ?
-না বেশি কিছু না..এই আর কি..
:আমতা আমতা করছিস কেন.. আমাকে একটু খুলে বল, এর একটা সমাধান করতে হবে।
-সমস্যাটা কোথায় ভাইয়্যা.. তুমি একটু হিসেব করে খরচ করলেই তো পারো…
:আরে কী বাজে বকছিস.. মাসে আমাকে মাত্র ১ হাজার টাকা দেয়, ৪১ হাজার টাকা বেতন থেকে নিজে ভোগ করি মাত্র ১ হাজার টাকা। আর মাকে দেই মাসে দুই হাজার টাকা মাত্র। বাকী আটত্রিশ হাজার টাকা তোর ভাবীর পেটে যায়।
-বাচ্চাদের স্কুল, বাসা ভাড়া.. বাজার খরচ.. এসবে তো অনেক খরচ হয় ভাবীর..

:আরে ওসব আমি পৈ পৈ করে হিসাব করে দেখেছি, সব মিলিয়ে ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকা খরচ হয়, বাকিটা তোর ভাবী মারে।
-মারে বলছো কেন, হয়তো ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য জমায়।  
:আরে দুঃখটা তো আমার এখানেই, আমার ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য জমালে তো ঘটনা এতোদূর গড়াতো না। তোর ভাবীর ছোটো বোনের বিয়ের মাসখানেক বাকি আছে। গত কয়েক মাস ধরেই সে নানা অজুহাতে সংসার খরচ বেশি দেখাচ্ছে। আমি বিশ্বাস করিনি, এখন উল্টো আমাকে বেশি খরচের অপবাদ চাপিযে দেওয়া হচ্ছে।

-শালীর জন্য একটা কর্তব্য তো ভাইয়া তোমার আছেই, ভাবী হয়তো বিয়েতে বড় ভালো কোনো উপহার দিতে চায়।
:আরে দিক.. তাতে তো আমার কোনো আপত্তি নেই, তোর ভাবীর রাজনীতি তুই বুঝিস?

কথা আর বেশিদূর এগোয়না.. কাজের মেয়েটা আসছে ট্রে হাতে।
কোনোমতে চাতে চুমুক দিয়ে কায়েস উঠলো।

কিছুটা চিন্তিত এবং কিছুটা হালকা মেজাজে কায়েস বাসায় ফেরার জন্য রিকশা ধরলো। মেক্সিতে আর উঠতে আজ মন চাচ্ছে না। পথে শাহবাগের মোড়ে রিকশা থামিয়ে শম্পার জন্য কয়েকটা রজনীগন্ধা কিনলো। শম্পার জন্য মনটা একটু খারাপ লাগছে। শম্পা আসলে মেয়ে হিসেবে খারাপ নয়, একটু আহ্লাদী, ঢঙ্গি। ইগোটা একটু বেশি। থাক, ইগো বেশি থাকাই ভালো। অনন্ত আমার পকেট থেকে তো টাকা মারার স্বভাব নেই— এভাবেই কায়েস একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।

বাসার নিচে এসে রিকশা ভাড়া দিতেই কায়েসের মনে হলো, ফুল হাতে বাসায় ঢুকবে কিভাবে! আজ তো কোনো উপলক্ষ্য নেই.. মা যদি দরজা খোলেন, তাহলে তো রীতিমত বিপর্যস্ত হতে হবে। শম্পাকে ফোন করে নিচে আসতে বললে কেমন হয়..
মুঠোফোনে টুন টুন আওয়াজ বেজে চলছে, ধরার নামগন্ধ নেই। শম্পা কি আবার রাগ করে সত্যিই বাসা ছাড়লো নাকি? তাহলে তো সর্বনাশ!
হঠাৎ দেখে নিচের কলাপসিবল গেইটের তালা খোলার শব্দ।
তাকিয়ে অবাক কায়েস, এযে সাক্ষাৎ শম্পা! শম্পা কী করে বুঝলো, কায়েস নিচে এসে ওকে ফোন করেছে। কায়েস আরেকটা ধাক্কা খেলো, এই যে শম্পা কথায় কথায় তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলায়ের কথা শোনায়, খালি খালি তাহলে না। যে বিভাগেই পড়ুক না কেনো, এই বিশ্ববিদ্যলয়ে পড়লে মাথায় আসলেই কিছু একটা বেশি পরিমাণে বাড়ে। কোনো কাজ না করেও কায়েসের সহকর্মী রুবিনা সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়, উপস্থিত বুদ্ধিতে সবাইকে বোকা বানিয়ে ছাড়ে। সবাই বলে আরে ঢাকা ভার্সিটির মেয়ে যে!
শম্পাও এর ব্যতিক্রম না।
কায়েসের একটু লজ্জাই লাগছে, চট করে কিভাবে বউয়ের হাতে ফুল তুলে দিবে.. তাই ফুলগুলো হাতের সামনে রেখে মানিব্যাগে টাকা গোঁজার ভান করছে, অন্তত শম্পাই যেন আগ বাড়িয়ে ফুলের কথা জিজ্ঞেস করে, বা ফুলের দিকে তাকিয়ে শম্পার অনুভূতি টের পাওয়া যাবে। কিন্তু ফুলের দিকে তো শম্পা তাকাচ্ছে না।
কী ব্যাপার কিছু বলছো না যে— কায়েসই কথা শুরু করে। ওপরে আসো তাড়াতাড়ি— বাসায় সবাই তোমার জন্যই অপেক্ষা করছে।
শম্পাকে আগ বাড়িয়ে ফুল হাতে দেওয়ার আগেই শম্পা ধপ করে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো। শম্পা খুব মোটা না, কিন্তু মোটা তো অত দ্রুত কিভাবে সিড়ি বেয়ে উঠলো, তাই ভেবে পাচ্ছে না কায়েস। আস্তে আস্তে দুইতলায় উঠে দেখলো, বাসায় বেশ লোকজন হৈ হুল্লোড় করছে। আরে বড় আপা যে.. কেমন আছো?
বড় আপা কায়েসের প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই চেঁচিয়ে মেয়েকে ডাকতে শুরু করলো.. সামিয়ান তোমার ছোটো মামা এসে পড়েছে… দেখো মামা তোমার জন্য ফুল নিয়ে এসেছে।
সামিয়ান ছুটে এসে হাত থেকে ফুল ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে বললো, মামা দেখো আব্বু বিশাল বড় একটা কেক এনেছো, জানো মামা আমি ফার্স্ট হবো এটা স্বপ্নেও ভাবিনি, আমার সহপাঠীরা তো ভীষণ হিংসা করছে। আসো কেক কাটি, সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলো, যেই না তোমাকে ফোন করতে যাবো আর অমনিতেই তুমি এসে পড়েছো। বড় মামার বাসায় ফোন করেছিলাম, কেউ ধরছে না।

এমন সময় কায়েসের বড় আপা, শম্পার কাধে হাত রেখে বললেন, তুমি আবার এসব ফুল টুল আনানোর ঝামেলা করতে গেলে কেন?…যাই হোক সামিয়ান কিন্তু ফুল পেলে সবসময়েই খুব খুশী হয়, নতুন এসেই তুমি আমার মেয়েকে দেখি বেশ ভালোই বুঝে ফেলেছো। তোমার আসলে প্রশংসা করতেই হয়। শম্পা মুখটা এমনভাবে হাসি হাসি করে রাখলো যেন ওই কায়েসকে বলে ফুল আনিয়েছে।

কায়েস শম্পার হাতে ফুলটা পৌঁছে দিতে না পারায় ভেতরে ভেতরে যে দুঃখটুকু পেয়েছিলো, শম্পার হাসি দেখে তা মুছে গেলো। তবে সে রাগ করেনি, অনন্ত ভাগনীর অপ্রত্যাশিত ভালো রেজাল্ট পাওয়া উপলক্ষে বাসার পরিবেশটা ভালো হয়ে উঠলো, এটাই বা কম কিসের! আর মামার কাছ থেকে সামান্য একটু ফুল পেয়েই ভাগনীটা যেভাবে খুশিতে লাফ দিলো, কায়েসের ভালোই লাগছিলো।

কায়েস ঠিক করলো, এবার নতুন বছর উপলক্ষে ভাই-বোন-ভাগ্নে-ভাতিজি, সবাইকে খুব দর্শনীয় উপহার কিনে দিবে। বাজেটে কার্পণ্য করবে না, যতদূর পারা যায় বেছে বেছে বেশ ভালো উপহার দিবে। রোজ খবরের কাগজ পড়ছে, কী চলছে, ফ্যাশনের ট্রেন্ড এখন কি— সবকিছুই। শম্পার চোখ এড়িয়ে ইদানীং খেয়াল রাখছে কী কী রঙ শম্পার পছন্দ। সংবাদপত্রের ফ্যাশন পাতায় ডিসেম্বরের ১ম সপ্তাহে একটা মডেলের পড়া শাড়ির নকশাটা বেশ মনে ধরলো কায়েসের। কায়েস ভাবলো আজ অফিস থেকে কোনো এক ফাঁকে বের হয়ে শাড়িটা কিনে অফিসের ড্রয়ারে আটকে রাখবে। পরে যদি স্টক শেষ হয়ে যায়! শম্পাকে মানাবে দারুণ। হঠাৎ মনে হলো শম্পা পছন্দ করবে তো! কিন্তু আগে থেকে শম্পাকে বললে তো আর থার্টি ফার্স্ট নাইটে শম্পাকে সারপ্রাইজ দেওয়া হবে না।
শম্পার সামনে খুব মনোযোগ দিয়ে কায়েস শাড়িটা দেখছে, অনন্ত ভালোমন্দ কিছু মন্তব্য করবে এটাই সে আশা করছে। শম্পার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই, কায়েস নিজে নিজেই বললো.. বেশ শাড়িটা…
-থাক হয়েছে.. আমাকে আর শাড়ির উছিলা দিতে হবে না, ওরকম শরীর দেখানো কোনো মেয়ের ছবি ছাপা হলেই তুমি হুমড়ি খেয়ে পড়ো.. এটা তো নতুন কিছু না, দুদিন পরে আমিও হাতাবিহীন ব্লাউজ পরে.. সবার সামনে ঘোরাঘোরি করবো, এই আমি বলে রাখলাম।

ঘটনার আকস্মিকতায় কায়েস চুপসে গেলো। কী ভেবেছিলো আর কি হলো, কী দেখলো আর স্ত্রী কী ভাবলো। কিন্তু এই প্রথমবারের মতো রাগ না করে কায়েস ঠাট্টা শুরু করলো.. হ্যাঁ তুমি ঠিকই ধরেছে.. আসলেই এবার নতুন বছর উপলক্ষে তোমাকে এরকম একটা শাড়ির সাথে এরকম হাতাবিহীন  ব্লাউজের একটা শাড়ি কিনে দেবো.. তোমাকে এই মডেলের চেয়ে এক হাজার গুণ বেশি সুন্দর লাগবে!
কায়েসের সামনে অভিমানী চোখে স্ত্রী মুচকি হেসে ফ্যাশন পাতাটা হাতে নিলো, এই শাড়ির তো অনেক দাম, সাড়ে ৬ হাজার টাকা!
কায়েস স্ত্রীর কাছে ঘেঁষে বললো— সাড়ে ৬ কেন, সাড়ে বারো হাজার টাকা হলেও এই শাড়ি তোমাকে এবারের থার্টি ফার্স্টে আমি উপহার দিবো।
শম্পা আহ্লাদে গলে একাকার হয়ে গেলো, মুহূর্তেই কায়েসের কাঁধে হেলান দিয়ে বললো— আগে শাড়িটা আমি বুটিকসে গিয়ে সরাসরি একবার দেখে আসবো, তারপরে একসঙ্গে গিয়ে কিনবো। কায়েস রাজি হয়ে যায় একশর্তে, শাড়ি তুমি থার্টি ফার্স্ট নাইটে হাতে পাবে।
শম্পাও বলে আচ্ছা তবে।
ইদানীং শ্ম্পার সাথে বোঝাপড়াটা একটু বেশ ভালোই হচ্ছে। শম্পার একটা জিনিস কায়েসের খুবই ভালো লাগছে, যার জন্য উপহার কিনছে তাই রিসিটসহ দিচ্ছে। শম্পার কথা পছন্দ সবার এক না, পছন্দ বা সাইজে না হলে যে কেউ গিয়ে বদলে আনতে পারবে।

শম্পা আজ কায়েসের অফিসে ফোন করেছে। বিয়ের পরে গত কয়েকমাসের মধ্যে এই প্রথম শম্পা অফিসের টেলিফোনে ফোন দিলো। বললো— তোমার মোবাইল বন্ধ পেলাম, তাই করেছি। কায়েস খুশি হয়— যাক চার্জ শেষ হয়ে যাওয়াতে ভালোই হলো— স্ত্রীর টান প্রকাশ হলো।
:বুটিকে গিয়েছিলে?
-হ্যা, বেশ সুন্দর শাড়িটা
:আচ্ছা, আজ সন্ধ্যায় অফিস শেষে আমরা গিয়ে ওই শাড়িটা কিনবো, ঠিক খবরের কাগজে যে কাঁঠালী রঙটা ছাপা হয়েছে, ওই রঙেরটা আছে তো?
-হ্যা, ওটা আছে, সবগুলোর মধ্যে ওই রঙটাই সুন্দর।
টেলিফোন রেখে কায়েস দেখে রুবিনা ঘাড় কাত করে কায়েসের দিকে তাকিয়ে আছে।

:কি কায়েস ভাই, নতুন ভাবীকে নিয়ে খুব কেনাকাটা করছেন?
-হ্যা, এই আর কি.. গেল ঈদে তো বিয়ে পরবর্তী ঝামেলায় তেমন কোনো কেনাকাটা করা হয়নি, তাই নতুন বছরটাকে সেলিব্রেট করবো ভাবছি।
‘বিয়েটা দেখছি তাড়াতাড়ি সেরে ফেলতে হবে.. স্বামীর কাছ থেকে বাসায় বসে বসে ভালো শাড়ি পাওয়া যাবে!’ রুবিনা উচ্চস্বরে ঠাট্টা শুরু করলো কায়েসের সঙ্গে।

অন্যান্য ডেস্কের সহকর্মীরাও সব হো হো করে হেসে উঠলো। বাইরের রোদের তীর্যক আলো কাচের জানালার গ্লাস ভেদ করে কায়েসের ডেস্কে পড়ছে। কায়েস পর্দাটা টানতেই এগিয়ে এলেন অফিসের বহুদিনের পুরানো সহকর্মী বশির আহমেদ। বললেন, থার্টি ফার্স্ট নাইট উপলক্ষে বাসায় পার্টির আয়োজন করেছি, ভাবীকে নিয়ে আসবেন। ভাবীকে ছাড়া কিন্তু আপনাকে ঢুকতে দিবো না! কায়েস মুচকি হেসে সায় দিলেন।

বাসায় ফিরে কায়েস রুবিনার সঙ্গে থার্টি ফার্স্ট নাইটের পার্টির কথা তুলতেই রুবিনা বললো— ও মাই গড আমি কী পরে যাবো?
-কেন, নতুন যে শাড়িটা কিনবে সেটা পড়ে!
:তাহলে ব্লাউজ বানাতে হবে না?
-ওকে, কাল গিয়ে তুমি শাড়িটা কিনে নিয়ে এসো। ব্লাউজ বানাতে দিয়ে দাও দ্রুত।
:না, তুমি কিনে এনে দিবে বলেছিলে, তুমিই দাও প্লিজ!
-আচ্ছা, ফেরার সময় আমি নিয়ে আসবো।

পরদিন অফিসে লাঞ্চ ব্রেকের সময় কায়েস খেয়াল করলো রুবিনা একটা প্যাকেট নিয়ে অফিসে ফিরলো। দু্য়েকজন নারী সহকর্মী রুবিনার হাতের ব্যাগের ভেতর উঁকিঝুকি মারছেন।

ঠিক পাশের টেবিল বলে কথা, চাইলেই সবকছু উপেক্ষা করা যায়না। কানে ভেসে এলো একজনের আওয়াজ, রুবিনা আপা আপনার চয়েস এতো ভালো!
আরে এই শাড়িতো আমাদের কায়েস সাহেবই আমাকে দেখিয়ে দিয়েছেন।
-কি! কী বললেন.. ম্যাডাম আপনি..? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কায়েস হতভম্ব হয়ে জানতে চায়।

:বুঝতে পারছেন না। আপনি অফিসে বসে ড্রয়ার খুলে বাড়ি থেকে আনা যে ফ্যাশন পাতাটি দেখছিলেন, সেখানে আমারও নজর পড়েছিলো আর কি। ভাবলাম, ওই শাড়িটা কিনে আপনাকে একটা সারপ্রাইজ দেই নতুন বছর উপলক্ষে।

কায়েস আর সহ্য করতে পারছে না। এতোটা নির্লজ্জ মেয়েরা কী করে হয়? কায়েস কিছুটা ইতস্তত বোধ করে। কায়েসের বিয়ের পর এক সহকর্মী বলেই ফেলেছিলো, শেষমেষ রুবিনা ম্যাডামের হাত থেকে আপনি তাহলে মুক্তি পেলেন— স্রেফ আল্লাহর রহমত! অফিসে আপনাকে এমন জ্বালায়, এ যদি আপনার ঘরণী হতো, তবে তো জীবন আপনার বদলে যেতো! আরে ঢাকা ভার্সিটিরি মেয়ে যে!
 
কায়েস সিদ্ধান্ত নেয় যে মহিলাকে কায়েস মোটেও পছন্দ করে না, সেই মহিলার মতো হুবহু একই রঙের শাড়ি সে মরে গেলেও কিনবে না।

অফিস থেকে ছুটির অনেক আগেই বের হয়ে যায় কায়েস। বেশ নামী একটা ফ্যাশন হাউসে গিয়ে আগের পছন্দ করা শাড়িটির দামের চেয়ে দ্বিগুণ দামে কায়েস একটা শাড়ি কিনে বাসায় ফিরে। এতো এক্সক্লুসিভ শাড়ি যে দেখেই বোঝা যায়।

শম্পাকে কী বলবে মনে মনে সে একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ফেলে। প্যাকেট হাতে দিয়েই সে বলে— ওই শাড়িটার চেয়ে আরো গর্জিয়াস শাড়িতে তোমাকে আমি দেখতে চাই, আরো অনেক বেশি দাম দিয়ে…নাও।

শম্পা খুশিতে আপ্লুত হয়ে ওঠে, এতো টাকা খরচ করতে কে বলেছে তোমায়? আগেরটা কিনলেও অবশ্য খারাপ হতো না..!

শম্পা’র উত্তেজনা, আবেগ, উজ্জ্বল চোখ দেখতে ভালো লাগছে কায়েসের।

খুব সেজেগুজে শম্পা তৈরি থার্টি ফার্স্টের পার্টির জন্য। কায়েসের টাই বেঁধে দিলো সে নিজ হাতে। কায়েসের মনটা খুব ভালো হয়ে যায়। বিয়ের পর এই প্রথম সে শম্পার এতোটা কাছে আসতে পেরেছে বলে তার মনে হচ্ছে।

ঠিক রাত এগারটার মধ্যে কাকরাইলে স্বস্ত্রীক উপস্থিত হলো কায়েস। সহকর্মীর বাসার নিচে গাড়ির লাইন দেখেই কায়েস বুঝে নেয় যে অনেকেই চলে এসেছে। এবং রুবিনাও এসেছে। রুবিনার লাল গাড়িটা ঠিক গেইটের বাম দিকে ঘেঁষে পার্ক করা। লিফটে ওঠা মাত্রই কায়েসের বুকে ধড়ফড় হতে লাগলো কি এক অজানা কারণে। সামাজিক অনুষ্ঠানে একসঙ্গে অনেক মানুষ দেখে সে একটু ঘাবড়ে যায়, এটা নতুন কিছু না। আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হতে হবে— নিজেকে এভাবেই সান্ত্বনা দেয় সে।

কায়েস-শম্পা দুজনে ঘরে প্রবেশ করতেই রুবিনা— হ্যালো কায়েস ভাই, এতো দেরি যে? কি ভাবী যে কাঁঠালী রঙের শাড়িটা পড়ে এলো না? ও আচ্ছা, কায়েস ভাই, আপনার চয়েস কিন্তু আসলেই ভীষণ ভালো, এজন্য ধন্যবাদ দিয়ে আপনাকে ছোটো করতে চাই না। কায়েস কী বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। হতভম্ব হয়ে শম্পার দিকে তাকাতেই সে দেখতে পায়, শম্পা স্তব্ধ। অবাক হয়ে রুবিনার শাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। এরপর কেউ কিছু বোঝার আগেই শম্পা দ্রুত দুই পা চালিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে এলো। শম্পা ছুটছে, কায়েসও তার পিছু নিলো। এতো বড় সারপ্রাইজ কায়েস আর কোনো থার্টি ফাস্টে পায়নি।

শেয়ার করুন