গোলাম আজম, নিজামী, সাঈদীর পুনর্বিচারের আবেদন খারিজ

0
92
Print Friendly, PDF & Email

 

ঢাকা ( ৩ জানুয়ারী) :  মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম, বর্তমান আমির মতিউর রহমান নিজামী ও নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলা পুনরায় শুরু করতে আসামিপক্ষের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

তবে সাঈদীর মামলায় দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) ফের শুনবেন ট্রাইব্যুনাল। আগামী ১৩ ও ১৪ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষ এবং ১৫, ১৬ ও ১৭ জানুয়ারি আসামিপক্ষকে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য করে দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ১ ঘণ্টা তা খণ্ডনের জন্য রাষ্ট্রপক্ষ সময় পাবেন।

চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল বৃহস্পতিবার এ আদেশ দেন।

গোলাম আযম, সাঈদী ও নিজামীর বিরুদ্ধে মামলার পুনবির্চারের জন্য গত ১৯ ও ২৩ ডিসেম্বর আবেদন তিনটি করেন আসামিপক্ষ। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ বেলজিয়ামের ব্রাসেলস প্রবাসী বাংলাদেশি আহমেদ জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর পদত্যাগী চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের স্কাইপি সংলাপকে কেন্দ্র করে মামলা তিনটির বিচার কার্যক্রম পুনরায় শুরু করতে আবেদনগুলো করেছেন আসামিপক্ষ।

২৪ ডিসেম্বর থেকে ৬ কার্যদিবসে আবেদনগুলোর ওপর শুনানি শেষ হয় মঙ্গলবার। আসামিপক্ষে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এমপি, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, সিনিয়র আইনজীবী বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন, আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ও অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম। অপরদিকে আবেদনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী।

বিচারপতি নিজামুল হকের অভিযোগ (চার্জ) গঠন আইনসম্মত হয়নি দাবি করে আসামিপক্ষ শুনানিতে বলেন, ‘‘বাইরে থেকে পাঠানো চার্জ অনুযায়ী বিচারপতি যে চার্জ গঠনের আদেশ দিয়েছেন তা অবৈধ। নতুন করে এ মামলার চার্জ গঠন করতে হবে। না হলে এটি একটি খারাপ নজির স্থাপন হবে। এ বিচার গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।’’

আসামিপক্ষের দাবি, ‘‘১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করেছেন, তাদের বিচারের জন্য দালাল আইন করা হয়েছিল। সেই দালাল আইনে তাদের বিচার হয়েছে। আর মূল আসামিদের বিচারের জন্য আইসিটি অ্যাক্ট’১৯৭৩ করা হয়েছিল। ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাকে ক্ষমা করে দিয়ে ৪১ বছর পর তাদের সহায়তাকারীদের বিচার করাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক।

জবাবে রাষ্ট্রপক্ষ বলেন, ‘‘আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে রি-ট্রায়াল (পুনরায় শুরু) করার কোনো সুযোগ নাই। আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের কোনো সদস্য পদত্যাগ করলে রি-ট্রায়ালের আবেদন করা যায় না।’’

‘‘দালাল আইনে যাদের বিচার হয়েছিল, তারা একাত্তরে অপরাধ করেছিলেন ব্যক্তিগতভাবে। আর এখন যাদের বিচার করা হচ্ছে, তারা অপরাধ করেছেন দলের নেতা হিসেবে।’’

‘‘এই বিচার কাজকে বিলম্বিত করার জন্য সময়ক্ষেপণ করতেই আসামিপক্ষ মামলা পুনরায় শুরুর আবেদন করেছেন’’ বলেও অভিযোগ তোলেন রাষ্ট্রপক্ষ।

ট্রাইব্যুনাল-১ এ গোলাম আযম, নিজামী ও সাঈদী ছাড়াও বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার চলছে। এর মধ্যে গত ৬ ডিসেম্বর সাঈদীর মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হলে তার বিরুদ্ধে রায় যে কোনো দিন দেওয়া হবে  উল্লেখ করে মামলাটির রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ (সিএভি) রেখেছিলেন পদত্যাগী চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল।

এখন নতুন করে যুক্তিতর্ক শুনে আইন অনুসারে সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করবেন ট্রাইব্যুনাল।

নিজামীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের দ্বিতীয় সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের পর আসামিপক্ষ জেরা শুরু করেন। আসামিপক্ষের দায়ের করা পুনর্বিচারের আবেদনের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মামলার বিচার কার্যক্রম মুলতবি থাকবে বলে ট্রাইব্যুনাল আদেশ দিয়েছিলেন।

গোলাম আযমের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আসামিপক্ষে সাফাই সাক্ষ্য শুরু হয়েছিল। গোলাম আযমের ছেলে বরখাস্তকৃত সেনা কর্মকর্তা আব্দুল্লাহিল আমান আযমী বাবার পক্ষে প্রথম সাফাই সাক্ষী হিসেবে সাফাই সাক্ষ্য দিচ্ছিলেন। কিন্তু পর পর কয়েকটি ধার্য তারিখে সাফাই সাক্ষী ও তার আইনজীবী উপস্থিত না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত ঘোষণা করে যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপনের দিন ধার্য করে দিয়েছিলেন।

এখন যেখানে মুলতবি করা হয়েছিল, সেখান থেকেই শুরু করে অব্যাহত থাকবে গোলাম আযম ও নিজামীর বিরুদ্ধে মামলার বিচারিক কার্যক্রম।

এছাড়া সালাউদ্দিন কাদের সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ চলছিল। তিনিও বেশ কয়েকটি আবেদন করেছেন। এ কারণে ওই মামলার বিচারিক কার্যক্রমও বর্তমানে মুলতবি রয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ৮ ডিসেম্বর বিচারপতি নিজামুল হকের স্কাইপি সংলাপ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিদেশি পত্রিকা দ্য ইকোনমিস্ট। পরে ওই স্কাইপি সংলাপ নিয়ে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এরপর গত ১১ ডিসেম্বর বিচারপতি নিজামুল হক পদত্যাগ করায় দু’টি ট্রাইব্যুনালই পুনর্গঠন করা হয়।

শেয়ার করুন