সরকার পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে বছর শেষ, সব সম্মান পদ্মায় বিসর্জন

0
121
Print Friendly, PDF & Email

ঢাকা ( ৩১ ডিসেম্বর) : বড় কলেবরের কয়েকটি দুর্নীতির অনুসন্ধান-তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের কারণে বিদায়ী বছরজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলো দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এ বছরই প্রথমবারের মতো বিদেশে পাচার হওয়া টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার প্রথম নজির গড়ে দুর্নীতি বিরোধী এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।

আবার পদ্মাসেতুতে পরামর্শক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলা থেকে বহুল সমালোচিত দুই সাবেক মন্ত্রীকে বাদ দিয়ে কেবল সরকার পক্ষ ছাড়া প্রায় সব মহলের সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হতে হয় কাগজে-কলমে স্বাধীন এই কমিশনকে।

এ ঘটনার রেশ ধরে এও বলা হচ্ছে, মহাজোট সরকারের প্রথম তিনবছর মন্থর গতিতে চলা দুদক ২০১২ সালে সক্রিয় হয়ে উঠলেও পদ্মাসেতু কেলেঙ্কারিতে সরকার পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে বছর শেষ করছে সব সম্মান পদ্মায় বিসর্জন দিয়ে।

বস্তুত পদ্মাসেতু  দুর্নীতির ষড়যন্ত্র মামলায় সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীকে বাদ দেওয়ায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে দুদক।

এছাড়া বছর জুড়ে আলোচনায় ছিলো-হলমার্ক কেলেঙ্কারি, ডেসটিনির অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ ভিওআইপির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার, রেলওয়ের অর্থ কেলেঙ্কারি ও নিয়োগে অনিয়মের  মতো জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ঘটনা।

এসবের বাইরে দুর্নীতিতে অভিযুক্তদের দুদকের প্রধান কার্যালয়ে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনাও প্রতিষ্ঠানটির অধ্যায়ে নতুন মাত্রা যোগ করে। সাড়া ফেলে দুদকের দুর্নীতিবাজ পাকড়াও অভিযানও।

পদ্মাসেতু কেলেঙ্কারি দায় থেকে দুই আবুল বাদ
নানামুখী ঘটনাপ্রবাহের পর বিশ্বব্যাংকের ক্রমাগত চাপে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করে গত ৪ ডিসেম্বর কমিশনে (দুদক চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার) প্রতিবেদন দেয় দুদকেরই অনুসন্ধান টিম। কিন্তু  ১৭ ডিসেম্বর সাবেক দুই মন্ত্রীকে বাদ দিয়ে সাবেক সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়াকে প্রধান আসামি করে বনানী থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

এ নিয়ে দেশজুড়ে যখন বিতর্ক দেখা দেয়, তখন দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়, মামলার পর তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, মামলায় দুই আবুলকে বাদ দেওয়ায় দুদকের প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমেছে।
 
তিনি বলেন, ‘‘সরকার ও দুদক সব সময় প্রভাবমুক্ত হয়ে পদ্মাসেতুর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বললেও আমরা বাস্তবে অতীতের ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন দেখেছি। এতে নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে পদ্মাসেতুর ভবিষ্যৎ।’’

তবে দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান মনে করেন, চলতি বছর দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকের কার্যক্রম ছিল স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ।

এবছর উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “হলমার্ক, ডেসটিনি, রেলের নিয়োগ বাণিজ্য, অবৈধ ভিওআইপি, বিদেশ থেকে পাচার করা টাকা (আরাফাত রহমান কোকো) দেশে আনাসহ দুদকের বেশকিছু কার্যক্রম ছিল প্রশংসিত।”

পদ্মাসেতু দুর্নীতির ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা মামলায় সাবেক দুই মন্ত্রীকে বাদ দেওয়ায় কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তথ্য-উপাত্ত ছাড়া কারো বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া যায় না। মামলার পর এখন তদন্ত চলছে। তদন্তে অনেক কিছুই বেরিয়ে আসতে পারে। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে, সে যেই হোক।“

তানভীর-জেসমিন: আয়েস-বিলাস থেকে শেকলবন্দি জীবন
আগের জীবন ছিল বিলাসবহুল, আরাম-আয়েসের। ছিলো একাধিক মার্সিডিজসহ দামি গাড়ি, রাজকীয় বাড়ি। সোনালী ব্যাংকের টাকায় আমোদ-ফূর্তিতে কেটেছে হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তানভীর মাহমুদ এবং তার স্ত্রী ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামের।

কিন্তু দুদকের মামলায় জড়িয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে তাদের ঠাঁই হয়েছে কারাগারে। দেশের ব্যাংকি খাতে নজিরবিহীন ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় ২৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুদক।

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা (সাবেক শেরাটন) শাখা থেকে ভুয়া এলসির মাধ্যমে হলমার্কের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় ৪ অক্টোবর মামলা দায়ের করে দুদক। এতে হলমার্ক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ, চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম, জিএম তুষার আহমেদ ও সোনালী ব্যাংকের রুপসীবাংলা শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক ও ডিজিএম (সাময়িক বরখাস্ত) একেএম আজিজুর রহমানকে আসামি করে ২৭ জনকে  আসামি করা হয়।

মামলার এজাহারের উল্লেখ রয়েছে, ভূয়া এলসির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে ফান্ডেড এক হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা আত্মসাত করেছে হলমার্ক গ্রুপ। ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের যোগসাজসে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করে তারা।

প্রধান এ চার আসামিকে অক্টোবরের বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার করে দুদক। বর্তমানে রিমান্ড শেষে চার আসামি কারাগারে রয়েছেন। ডিসেম্বরের শেষ দিকে গ্রেফতার হন সোনালী ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মীর মহিদুর রহমান(ওএসডি), উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) শেখ আলতাব হোসেন ও সফিজউদ্দিন আহমেদ (সাময়িক বরখাস্ত)।

ডেসটিনির বিরুদ্ধে দুদকের অ্যাকশন
এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশজুড়ে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) ব্যবসা করে বিপুল সম্পদের মালিক বনে যাওয়া ডেসটিনির কর্তারা অবশেষে দুদকের মামলার জালে পড়ে এখন সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে।

অবৈধ প্রক্রিয়ায় তিন হাজার ২৮৫ কোটি টাকা স্থানান্তরের অভিযোগে সাবেক সেনাপ্রধান ডেসটিনি গ্রুপের সভাপতি লে. জেনারেল (অব.) হারুন অর রশিদ ও ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক(এমডি) রফিকুল আমীনসহ প্রতিষ্ঠানটির ২২ শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পৃথক দু’টি মামলা করে দুদক। গত ৩১ জুলাই রাজধানীর কলাবাগান থানায় এ মামলা দায়ের করা হয়।

এ মামলায় সাবেক সেনা প্রধান জামিনে রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির এমডি, চেয়ারম্যান মো: হোসেইন, পরিচালক দিদারুল আলম বর্তমানে রিমান্ড শেষে কারাগারে রয়েছেন।
ভিওআইপি: বিটিসিএলের সাবেক এমডিসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা

অবৈধ উপায়ে বিদেশি টেলিযোগাযোগ বা ভিওআইপির মাধ্যমে ২০৫ কোটি টাকা সরকারের রাজস্ব ক্ষতি ও আত্মসাতে জড়িত থাকার অভিযোগে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সাঈদ খান, বিটিসিএলের বর্তমান সদস্য (রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা) মোহাম্মদ তৌফিকসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে গত ৫ নভেম্বর রমনা থানায় পাঁচটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ মামলার অন্যতম আসামি একেএম আসাদুজ্জামানকে সম্প্রতি গ্রেফতার করেছে দুদক। বর্তমানে তিনি রিমান্ড শেষে কারাগারে আছেন।

জামিন চেয়ে পার পেলেন না সুরঞ্জিতের এপিএস
অবৈধ সম্পদের অভিযোগে দুদকের দায়ের করা মামলায় জামিনের আবেদন নাকচ করে সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের তৎকালীন সহকারী ওমর ফারুক তালুকদারকে গত ১০ ডিসেম্বর কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ থাকার অভিযোগ এনে গত ১৪ আগস্ট রমনা থানায় দায়ের হওয়া মামলায় তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

গত ৯ এপ্রিল রাতে রাজধানীর পিলখানায় বিজিবি সদর দপ্তরের ফটকে রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ব্যক্তিগত সহকারী ওমর ফারুক তালুকদারের গাড়িতে ৭০ লাখ টাকা পাওয়ার পর তা নিয়ে ব্যাপক শোরগোল ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, ওই অর্থ রেলে নিয়োগের ঘুষ হিসেবে নেওয়া হয়েছিল।

রেলের বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সাবেক মহাব্যবস্থাপক(জিএম) ইউসুফ আলী মৃধা ও কমান্ড্যান্ট এনামুল হকও ওই গাড়িতে সেদিন ফারুকের সঙ্গে ছিলেন। এই দু’জনের বিরুদ্ধেও অবৈধ সম্পদের অভিযোগে মামলা করেছে দুদক। তারা বর্তমানে পলাতক রয়েছেন বলে জানায় দুদক।

ওই ঘটনার পর এপিএসকে বরখাস্ত করেন সুরঞ্জিত। এরপরও অব্যাহত সমালোচনার মুখে রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। পরে তাকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করে রাখা হয়।

আজমের অপেক্ষায় দুদকের নয় মাস
৯ এপ্রিল রাতে সত্তর লাখ টাকার গাড়িটি ধরিয়ে দেওয়ার নেপথ্য নায়ক এপিএস ফারুকের গাড়িচালক আলী আজম খান। সেদিন বিজিবি ফটকে আজমই গাড়িটি ঢুকিয়ে দেন। এ ঘটনার পর থেকে আত্মগোপনে আছেন আজম।

সঠিক তদন্তের স্বার্থে আজমের বক্তব্য নিতে চাইলেও ব্যর্থ হয় দুদক। দুদক জানায়, এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি।

এদিকে রেলে নিয়োগ কেলেঙ্কারির ঘটনায় সুরঞ্জিতকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলা হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিতর্কের মুখে পড়ে দুদকের তদন্ত কার্যক্রম।

বিদেশে পাচারের টাকা দেশে ফেরত
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর বিদেশে পাচার করা ২০ লাখ ৪১ হাজার সিঙ্গাপুরি ডলার (১৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা) ফেরত এনেছে দুদক। গত ২২ নভেম্বর রাজধানীর সোনালী ব্যাংকের রমনা করপোরেট শাখায় দুদকের হিসাবে ওই পরিমাণ অর্থ জমা হয়।

দুদক জানায়, এ টাকার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো দেশ থেকে পাচার হওয়া টাকা ফেরত এসেছে। দুর্নীতি বিরোধী কর্মকাণ্ডে এ টাকা ব্যয় হবে বলে জানিয়েছেন দুদক চেয়ারম্যান।

দুদক কার্যালয়ে রিমান্ড
বিদায়ী বছরে আরো যে বিষয়টি সবচেয়ে আলোচিত হয়েছে তা হলো সেগুনাবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে দুদকের রিমান্ড। হলমার্ক কেলেঙ্কারির আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক আলোচনায় আসে সংস্থাটি। এরপর ডেসটিনি ও অবৈধ ভিওআইপি মামলার আসামিদেরও রিমান্ডে নেয় দুদক।

দুদকের গ্রেফতার
বিদায়ী বছরে দুদকের গ্রেফতার অভিযানও ছিল উল্লেখ করার মতো। পদ্মাসেতু দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দুদকের দায়ের করা মামলার প্রধান দুই আসামি সাবেক সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া ও সেতু বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (নদী শাসন) কাজী ফেরদাউসকে মামলার নয়দিন পরই গ্রেফতার করে দুদক।

এছাড়া মানি লন্ডারিং, অর্থ আত্মসাৎ, ভিওআইপি, জ্ঞাত আয় বহির্ভুত সম্পদের অভিযোগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদেরও গ্রেফতার করা হয়।

এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ডেসটিনি, হলমার্ক, সোনালী ব্যাংক, বিটিসিএল ও রেলের কর্মকর্তারা রয়েছেন।

নিউজরুম

শেয়ার করুন