ছাত্র রাজনীতি এখন একটি পেশা, নেতা হলেই বিলাসী জীবন

0
147
Print Friendly, PDF & Email

রুপসীবাংলা (২৩ ডিসেম্বর) এক সময় ছাত্রনেতারা ছিলেন নীতি ও আদর্শের প্রতীক। সেই পরিস্থিতি অনেক আগেই বদলে গেছে। ছাত্র রাজনীতি এখন একটি পেশায় পরিণত হয়েছে।

রাজনীতি করাই মানে অনেক আয়, অনেক শান-শওকত, ক্ষমতা, প্রভাব। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র নেতাদের দিকে তাকালে সেটাই মনে মনে হবে। আর সে কারণেই যেন রাজনীতি ছাড়তে চান না এসব নেতারা। বিয়ে হয়, সন্তানের বাবা হন, বাড়ি হয়, গাড়ি হয়, রাজনীতিও চলে সমান তালে। কারণ তাদের ছাত্রত্ব শেষ হয় না। ফলে তারা থেকে যান ছাত্র নেতাই।

ছাত্ররাজনীতিকে পুঁজি করে অনেক ছাত্র নেতাই আজ রীতিমতো কোটিপতি। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের ছাত্রনেতাদের কথা তুলে ধরে গত ১৯ ডিসেম্বর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করে দৈনিক কালের কণ্ঠ। ওই প্রতিবেদনের পর এর প্রতিবাদ জানিয়ে রাজনৈতিক দল দুটির ছাত্র নেতারা বা তাদের অনুসারীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে কালের কণ্ঠের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়। কি ছিলো ওই প্রতিবেদনে? পাঠকের জন্য এখানে তা হুবহু তুলে ধরা হলো।  

ছাত্রলীগ `সোনার ডিম পাড়া হাঁস`  

ছাত্রলীগের নেতৃত্ব যেন এক জাদুর কাঠি, যার ছোঁয়ায় ছাত্রনেতারা রাতারাতি বিত্তশালী বনে যান। কথিত আছে, ১৯৯৪ সালে ছাত্রলীগের সম্মেলনের মাধ্যমে এনামুল হক শামীম-ইসহাক আলী খান পান্না কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে শুরু হয় টেন্ডারবাজি, নিয়োগ, তদবির, কমিটি বাণিজ্য ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উপঢৌকন নেওয়াসহ নানা অনৈতিক কার্যকলাপ।

ছাত্রলীগের রাজনীতি করার সুবাদে বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা অঢেল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন। এই তালিকার ওপরের দিকে আছে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এনামুল হক শামীম, লিয়াকত শিকদার, মাহমুদ হাসান রিপন, মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটনের পাশাপাশি বর্তমান সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমের নাম। কালের কণ্ঠের এক অনুসন্ধানে ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।

ছাত্রলীগের একাধিক সাবেক নেতা মনে করেন, ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ সালের শামীম-পান্না কমিটি থেকেই মূলত ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে বিত্তশালী হওয়া ও ভোগবিলাসের সংস্কৃতি শুরু। ধারাবাহিকভাবে এর পরের নেতারাও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে টেন্ডারবাজি, নিয়োগ, তদবির ও কমিটি বাণিজ্য, ঠিকাদারিসহ নানা কাজে পকেট ভরেছেন। রাজনীতি না করেও টাকার বিনিময়ে এই সংগঠনে নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার নজির রয়েছে অনেক। সূত্র জানায়, বর্তমানে ছাত্রলীগের ইউনিট কমিটির মধ্যে ঢাকা মহানগর, ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, তেজগাঁও কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতারা `নেতা` হয়েছেন মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে।

এদিকে সাবেক হয়ে যাওয়ার পরও এখনো ছাত্রলীগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন বলে কয়েকজনের নামে অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম এনামুল হক শামীম, লিয়াকত শিকদার ও সাইফুজ্জামান শিখর। এঁদের আস্থাভাজন হতে পারলেই ছাত্রলীগের রাজনীতি করার টিকিট মিলে বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রলীগের সাবেক এক সহসভাপতি এসব তথ্য জানিয়ে আরো বলেন, ছাত্রলীগের গত সম্মেলনই এর প্রমাণ।

ওই নেতা আরো জানান, কার্যত শামীম, লিয়াকতসহ সাবেক বেশ কয়েকজন নেতার নির্দেশেই চলে ছাত্রলীগের কার্যক্রম। সরকারের এমন কোনো মন্ত্রণালয় নেই, যেখানে ছাত্রলীগের নেতাদের টেন্ডার বাণিজ্য নেই। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ভবন ও খাদ্য ভবনে ছাত্রলীগের নেতাদের আধিপত্য বেশি। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাব খাটিয়ে কাজ আদায় করে নেন এসব নেতা। তিনি জানান, বর্তমান সরকারের আমলে এই কয়েকজন নেতা মিলে সরকারের `একটি বাড়ি একটি খামার` প্রকল্প থেকেই কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

ছাত্রলীগের রাজনীতির এই অবস্থা সম্পর্কে সাবেক ছাত্রনেতা ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ছাত্রলীগের আগের রাজনীতি আর এখনকার রাজনীতি এবং নেতাদের মধ্যে বিশাল ফারাক। ছাত্রলীগের বর্তমান নেতাদের মধ্যে নীতি-আদর্শ নেই। তিনি বলেন, `তারা নেতা হয়েই বিত্ত-বৈভব আর আরাম-আয়েস করার স্বপ্ন দেখে। মূলত নব্বই দশকের পরই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে ভিন্ন ধারা আসতে শুরু করে।`

এ প্রসঙ্গে ছাত্রলীগের আরেক সাবেক নেতা নুরে আলম সিদ্দিকী বলেন, স্বাধীনতার অপর নাম ছাত্রলীগ। বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন, `বর্তমান ছাত্রলীগ নিয়ে আমি কোনো বক্তব্য দেব না। এদের নিয়ে কোনো কথা বলার আগ্রহ আমার নেই।`

 

ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে জানান, বর্তমান কমিটির দুই শীর্ষ নেতা নারায়ণগঞ্জের রূপপুরের কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে। ঢাকা কলেজ ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের কমিটি গঠনেও মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়েছে। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় কমিটি দেওয়া হয় ১০ লাখ টাকায়। পরে বিতর্কিত সেই কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। এসবের বিনিময়ে প্রভাবশালী ওই ছাত্রনেতাদের কেউ বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, কেউ নামি-দামি গাড়ির মালিক হয়েছেন। তবে গাড়ি বা বাড়িবিলাসের কথা অস্বীকার করে ছাত্রনেতারা দাবি করেন, ব্যবহার করা গাড়ি ও ফ্ল্যাট তাঁদের আত্মীয় ও বড় ভাইদের। তাঁরা ব্যবহার করার জন্য নিয়েছেন। পরে ফেরত দিয়ে দেবেন। বিশাল ফ্ল্যাটের মালিক এক ছাত্রলীগ নেতার দাবি, ওটা তাঁর ভাড়া করা ফ্ল্যাট।

সংগঠনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জানান, সমুদ্রসীমা বিজয় উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে ছাত্রলীগের দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠান উপলক্ষে কয়েক কোটি টাকার চাঁদা তোলা হয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। প্রায় সিংহভাগ টাকাই দুই শীর্ষ নেতার পকেটে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। জানা গেছে, সেই অর্থ দিয়ে বর্তমান কমিটির সভাপতি সোহাগ ও নাজমুল দুজনই এলিয়ন ব্র্যান্ডের দুটি প্রাইভেট কার কিনেছেন।

এ প্রসঙ্গে সিদ্দিকী নাজমুল আলম বলেন, নীতি-আদর্শ বজায় রেখে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতি করেন। তদবির ও টেন্ডার বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অভিযোগের কথা তিনি অস্বীকার করেন। ছাত্রনেতা হয়েও গাড়ি-বাড়ির মালিক হওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, `আমার ব্যবহার করা গাড়ি এক বড় ভাইয়ের, ফেরত দিয়ে দেব। ফ্ল্যাট সম্পর্কে বলেন, এক আত্মীয়ের বাসায় থাকি।`

ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এনামুল হক শামীম বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ছাত্রলীগের নেতা হওয়ার পর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। সৌভাগ্যই তাঁর পেছনে পেছনে ছুটেছে। টেন্ডারবাজি, তদবিরসহ নানা কৌশলে ফ্ল্যাট ও কয়েকটি গাড়ির মালিক এই নেতা। রাজধানীতে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা রয়েছে তাঁর।

বর্তমান কমিটির বেশ কয়েকজন নেতা বলেন, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এনামুল হক শামীম ও লিয়াকত শিকদারই বর্তমান ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রক। তাঁদের ম্যানেজ না করে ছাত্রলীগের নেতা হওয়া যায় না। তাই রাজনীতির চেয়ে `ভাই`দের ম্যানেজ করার চেষ্টা করি বেশি। তাঁরা আরো জানান, টেন্ডারবাজি, তদবির, কমিটি বাণিজ্যের মাধ্যমে ছাত্রলীগের নেতারা অনেক টাকার মালিক হয়েছেন এটা জানি। তার পরও রাজনীতিতে টিকে থাকতে তাঁদের কথা শুনতে হয়। এনামুল হক শামীম বুড়িগঙ্গা সেতুর টোল আদায়ের ইজারাও নিয়েছেন। জানা গেছে, প্রভাব খাটিয়েই তিনি এ কাজ বাগিয়েছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে নিয়োগ বাণিজ্য চালানোর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

লিয়াকত শিকদার ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। অত্যন্ত প্রভাবশালী এ নেতা ছাত্রলীগকে সব সময় `তুরুপের তাস` মনে করেন। ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান নেতার অনেকের কাছেই লিয়াকত শিকদার ভবিষ্যৎ নেতা বানানোর কারিগর হিসেবে পরিচিত। তাই সকাল-বিকেল অনেক ছাত্রনেতাই তাঁর বাসায় যান। সালাম করে দোয়া নিয়ে আসেন। জানা গেছে, গত এক দশকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় ও প্রভাবশালী যত ইউনিট কমিটি হয়েছে, তার সবই লিয়াকতের ইশারায়। বদৌলতে বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন তিনি। ছাত্রলীগের যখন যে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, ইউনিট কমিটি দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু দাপ্তরিক প্যাডে স্বাক্ষর করাই ছিল তাঁদের কাজ। কমিটিতে নাম বসান সাবেক নেতারা।

ছাত্রলীগের দাপটে লিয়াকত শিকদার রাজধানীতে ফ্ল্যাট, গাড়ি, প্লটের মালিক হওয়া এবং ঠিকাদারি ব্যবসাসহ বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে অল্প সময়ে বিত্তশালী হয়ে উঠেছেন। গত বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সময় স্টেডিয়ামের সংস্কারকাজসহ ক্রীড়া পরিষদ ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন টেন্ডারের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তাঁরই কমিটির এক সহসভাপতি। আরো জানা গেছে, এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারে রয়েছে কম্পিউটার ওয়ার্ল্ড বিডি নামে তাঁর একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। পাওয়ার কানেকশন নামে রাজধানীর আকরাম টাওয়ারে একটি অফিসও রয়েছে। এই সাইনবোর্ডের মাধ্যমে মূলত বিদ্যুৎ ভবনের টেন্ডার বাগিয়ে নেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়। সেগুনবাগিচায় রয়েছে লিয়াকতের সুরম্য ফ্ল্যাট।

 

লিয়াকত শিকদার তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা অস্বীকার করে বলেন, এসব অভিযোগ মিথ্যা। নতুন ষড়যন্ত্র। ছাত্রলীগের নেতা বানানো এবং মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেনের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, `ছাত্রলীগের নেতারা নির্বাচিত হয় সংগঠনের নিজস্ব নিয়ম-নীতিতে। এখানে আমার কোনো ভূমিকা নেই। সকাল-বিকেল তাঁর বাসায় ছাত্রনেতাদের উপস্থিতির কথাও অস্বীকার করেন তিনি। তবে এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকার কথা স্বীকার করেন।`

মাহমুদ হাসান রিপন ২০০৪ সালে ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন। সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েই শুরু হয় তাঁর ভাগ্যবদল। মূলত নিয়োগ বাণিজ্য, কমিটি বাণিজ্য, টেন্ডারবাজিই ছিল তাঁর আয়ের প্রধান উৎস। বর্তমান সরকারের আমলে এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে রিপনের প্রভাব নেই। ২০১১ সাল পর্যন্ত নেতৃত্বে থাকাকালে প্রতিদিন সকালে উঠেই সচিবালয়ে তদবিরের কাজে যেতেন বলে জানা গেছে। রাজধানীর অভিজাত এলাকার ফ্ল্যাটে বসবাস, কোটি টাকা ব্যয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান করা, গাইবান্ধার সাঘাটা থানায় বিশাল বাড়ি নির্মাণ, দামি গাড়ি, নামে-বেনামে বিপুল অঙ্কের ব্যাংক ব্যালান্সথএত কিছুর মালিক হয়েছেন ছাত্রনেতা হওয়ার সুবাদে। দুদক তাঁর সম্পদের অনুসন্ধানও করছে বলে একটি সূত্রে জানা গেছে।

জানা গেছে, রিপন বর্তমান সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকশন অফিসার নিয়োগ ও টেন্ডারকাজ করেছেন দলীয় প্রভাব খাটিয়ে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও বিভিন্ন টেন্ডার বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এই নেতা। তাঁর সঙ্গে মিলে কাজ করেছেন সাধারণ সম্পাদক রোটন। এভাবে রোটনও অনেক টাকার মালিক হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ বাণিজ্য করে কোটি টাকা আয় হয়েছে রোটনের। তাঁর ফ্ল্যাট রয়েছে পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালের বিপরীত পাশে।

তদবির, টেন্ডার বাণিজ্য ছাড়াও ছাত্রলীগ সভাপতি থাকাকালে রিপন সারা দেশে কমিটি দিয়েই কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। জানা যায়, ছাত্রলীগের প্রতিটি ইউনিটে কমিটি দেওয়ার সময় ১০ থেকে ২০ লাখ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বেশি টাকার বিনিময়ে পদ দিয়েছেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের এক ছাত্রনেতার কাছ থেকে টাকা নিয়ে পদ না দেওয়ায় তাঁর রোষানলেও পড়েন রিপন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাহমুদ হাসান রিপন পরে কথা বলবেন জানিয়ে আর কোনো কথা বলেননি। রিপনের সময়কার সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটনও অবৈধ পন্থায় অর্জিত টাকার ভাগ নিতেন।

ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমথদুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ২০১১ সালে জাতীয় সম্মেলনে তাঁরা নেতৃত্বে আসেন। অভিযোগ রয়েছে, উত্তরসূরিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁরাও মাত্র এক বছরের ব্যবধানেই বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন। তাঁদেরও অর্থের উৎস টেন্ডার ও তদবিরবাজি, কমিটি বাণিজ্য এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিভিন্ন দিবসকেন্দ্রিক চাঁদা ও উপঢৌকন আদায়। সম্প্রতি সাধারণ সম্পাদক নাজমুল উপঢৌকন হিসেবে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দামি একটি গাড়ি পেয়েছেন। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস করেন। সভাপতি সোহাগ থাকেন বেইলি রোডের একটি ফ্ল্যাটে।

ছাত্রদল নেতাদের বিলাসী জীবন  

ছাত্রদল নেতাদের দাবি, তাঁদের সেই সুদিন আর নেই। চলাফেরায় তাঁদের কেউ কেউ একটা `গরিবি` ভাবও ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু খোঁজ নিলে দেখা যাবে বাস্তবে তাঁরা ঠিক ততটা গরিব নন, যতটা তাঁরা বোঝাতে চান। আসল দুর্দিন হচ্ছে মূল দল বিএনপির ক্ষমতায় না থাকাটা। এটুকু `দারিদ্র্য` ছাড়া তাঁদের জীবনে সত্যিকারের অভাব বলতে কিছু নেই। তাঁরা থাকেন বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে। চড়েন নামি ব্র্যান্ডের দামি গাড়িতে। আর এগুলোর বেশির ভাগ তাঁরা আয়ত্ত করেছেন বিগত চারদলীয় জোট সরকার কিংবা তার আগের আমলে ক্ষমতার দাপটে- তদবির, টেন্ডার ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে।

 

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে যাঁরাই এর নেতৃত্বে ছিলেন তাঁদের অনেককে নিয়েই রয়েছে নানা কথা। রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন অনেকেই। জোট সরকারের আমলে হাওয়া ভবন ঘনিষ্ঠ ছাত্রদল নেতাদের দাপট ছিল অপরিসীম। ওই আমলে ছাত্রদলের নেতাদের কেউ কেউ প্রতিমন্ত্রীও ছিলেন। সেই সময়ের ছাত্রদল নেতাদের অনেকেরই ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। তাঁদের অনেকেই কোনো ব্যবসাপাতি নেই বলে দাবি করেন। বলে থাকেন, সাংগঠনিক কাজেই বেশি ব্যস্ত থাকেন তাঁরা। কিন্তু অনুসন্ধানে এই `বেকার` ছাত্রদল নেতাদের বহুবিধ ব্যবসা-বাণিজ্যের খবর জানা গেছে। পাওয়া গেছে তাঁদের নামে থাকা একাধিক প্লট ও দোকানের সন্ধান। কেউ কেউ এখন বিদেশে বসবাস করছেন। একেবারে সাধারণ অবস্থা থেকে ছাত্রদলের নেতৃত্ব পাওয়ার সুবাদে রাতারাতি বিত্তশালী হয়ে উঠা ছাত্রনেতাদের নিয়ে দলের ভেতরেই রয়েছে অনেক প্রশ্ন।

এ প্রসঙ্গে ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালনকারী ও বর্তমানে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু কালের কণ্ঠকে বলেন, `ছাত্রদল নেতাদের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে যে অভিযোগ করা হয়, তা সত্যি কি না সে সম্পর্কে আমি কিছু বলব না। তবে এটা সত্যি, আমাদের সময় ছাত্রদলের যে নীতি আদর্শ ছিল, তা থেকে এখনকার নেতারা অনেকাংশে সরে এসেছেন। এ অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।` তিনি আরো বলেন, `রাষ্ট্রের সব জায়গায় পচন ধরেছে। এমন সব মানুষ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত যা আমরা কখনোই ভাবিনি। সমাজের অংশ হিসেবে ছাত্ররাজনীতিও আলাদা নয়।`

১৯৯৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্বে থাকা এবং বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল বলেন, `সমাজের সর্বত্র অবক্ষয়। এই অবক্ষয় থেকে ছাত্রদলের রাজনীতি সম্পূর্ণ বাইরে থাকবেথএটাই আমাদের স্বপ্ন ও বিশ্বাস। কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব নয়।`  

 

১৯৮৭ থেকে ৯০ সাল পর্যন্ত ছাত্রদলের নেতৃত্বে ছিলেন আমান উল্লাহ আমান। জোট সরকার আমলে ছিলেন প্রতিমন্ত্রী। ছাত্রদল নেতাদের মধ্যে যাঁরা বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাঁর নামে-বেনামে প্রায় অর্ধশত প্লট, ফ্ল্যাট ও দোকান রয়েছে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন।

১৯৯০ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৯১ সালের জুন পর্যন্ত ছাত্রদলের শীর্ষনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আমান উল্লাহ আমান ও সানাউল হক নীরু। বর্তমানে নীরু বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত। ছাত্রদলে থাকা অবস্থায়ই নীরুর বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল। তিনি এখন ব্যবসা করেন।

বিভিন্ন সময় ছাত্রদলের নেতৃত্বে থাকা ফজলুল হক মিলন, খায়রুল কবির খোকন, নাজিম উদ্দিন আলম, আবুল খায়ের ভুঁইয়া ও শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি পরবর্তী সময়ে মূল দলের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছেন। তবে ছাত্রদলের নেতা থাকাকালে তাঁদের বিরুদ্ধেও তদবিরসহ বিভিন্ন অনিয়মে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগ শুনা যায়।
নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু ছাত্রদলের সভাপতি থাকাকালে তাঁর নামে কোটি কোটি টাকার টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল। ওই সময় পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা পিন্টু-আতঙ্কে ভোগতেন। পিন্টু বর্তমানে জেলে আছেন। ওই সময়ের ছাত্রনেতাদের মধ্যে সাহাবুদ্দিন লাল্টুর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়। বর্তমানে তিনি কানাডা প্রবাসী। ঢাকায় একটি সিএনজি স্টেশন রয়েছে তাঁর। তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বেয়াই হওয়ার সুবাদে লাল্টু ছাত্রনেতা থাকাকালেই বিরাট ব্যবসায়ী বনে যান।

ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিউল বারী বাবু বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি ছাত্র রাজনীতি করার সময় থেকেই ব্যবসা করছেন। এ প্রসঙ্গে বাবু বলেন, ঢাকায় ভাড়া বাসায় থাকি। কিছু ব্যবসা না করলে চলব কী করে? বাড়িভাড়া দেব কিভাবে?

সূত্র জানায়, ছাত্রদলের সদ্য বিদায়ী সভাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু ছাত্ররাজনীতির সুবাদে প্রচুর বিত্তের মালিক হয়েছেন। জোট সরকারের আমলে ঠিকাদারি ব্যবসা করে কোটি টাকার মালিক বনে যান। জোট সরকারের আমলে ঢাকা সিটি করপোরেশন থেকে দোকান পেয়েছেন রাজধানীর নিউ মার্কেটের পাশে নিউ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায়। আছে আরো অনেক সম্পদ। এ প্রসঙ্গে সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বলেন, `অনেকেই অনেক কথা বলে। এসব আমলে নিয়ে রাজনীতি হয় না। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা অপপ্রচার ছাড়া কিছুই না।`

ছাত্রদলের বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলীমের বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া দুর্নীতিপরায়ণ অন্য ছাত্রনেতাদের কাছেই রীতিমতো আলোচনার বিষয়। তাঁত ব্যবসাকে উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন বলে প্রচার করলেও নানা রকম ব্যবসা রয়েছে তাঁর। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে রয়েছে একটি প্লট। মগবাজারের বিশাল সেন্টারে রয়েছে দোকান। ওই দোকানের মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা বলে জানা গেছে। মোহাম্মদপুরের প্লটে টিনশেড ঘর তুলে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। আলীম বলেন, `মগবাজারে আমার বাসা ছিল। সেখানে আমার কোনো দোকান নেই। মোহাম্মদপুরে যে জমির কথা বলা হচ্ছে, সেটা আমার বাবার কেনা।`

ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল। আগের কমিটিতে তিনি সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তারও আগের কমিটিতে (লাল্টু-হেলাল) ছিলেন সহসভাপতি। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সিনিয়র ছাত্রনেতাদের কল্যাণে নেমে পড়েন ঠিকাদারি ব্যবসায়। সঙ্গে যোগ হয় টেন্ডারবাজি। ওই সময় তিনি বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল বলেন, `অভিযোগ যা করা হচ্ছে, তা মিথ্যা। আমি এখনো মা-বাবার সঙ্গে থাকি। তাঁরাই আমাকে চালান। আমার কোনো ঠিকাদারি লাইসেন্স নেই।`

ছাত্রদলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নেত্রকোনার হাবিবুর রহমান হাবিব বেড়ে উঠেছেন ঢাকায়। বিদায়ী কমিটির সহসভাপতি ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এর আগের (হেলাল-বাবু) কমিটিতে ছিলেন মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে। হাবিবের বিরুদ্ধে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস পূর্তমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর প্রশ্রয়ে অর্থের বিনিময়ে ঢাকা দক্ষিণের ছাত্ররাজনীতির পদ-পদবি নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র বাংলা নিউজ

শেয়ার করুন