হিন্দু বিশ্বজিৎ, আমাদের বিজয় ও শহীদ জননীর স্বপ্নের বাংলাদেশ!

0
121
Print Friendly, PDF & Email

ঢাকা (১৬ ডিসেম্বর) একটি বেদনা আমাকে খুব বেশি পীড়া দিচ্ছে। সম্প্রতি কয়েক নরপিশাচের হাতে নিহত, দর্জি-পথচারী বিশ্বজিৎ দাসের শেষ কথা ছিল- `আমি হিন্দু`। অর্থাৎ বিশ্বজিৎ মনে করেছিলেন `হিন্দু` পরিচয় দিলে ওরা তাকে মারবে না।

কী অসহায় আকুতি! আমরা কি তবে এই ‘হিন্দু’-মুসলমান’ কথাগুলো শোনার জন্য বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলাম ?

মনে পড়ছে, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের কথা। তিনি বলতেন, “এই দেশ সব ধর্মের মানুষের। সব ধর্মের মানুষই যুদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করেছে।”

তিনি বলতেন, “আমাদের বিজয় তখনই তাৎপর্যপূর্ণ হবে, যেদিন এদেশে ঘাতক-দালালদের বিচার সম্পন্ন হবে।”

স্বাধীন বাংলাদেশে আরেকটি মহান বিজয় দিবস উদযাপিত হচ্ছে। ত্যাগ আর প্রত্যয়ের চেতনা নিয়ে বাঙালি জাতি আবারও স্মরণ করছে মহান শহীদদের, যাদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয়েছিল এই ভূখণ্ড।

বাংলাদেশে বিজয়ের ৪১ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বর্তমান সরকার বিদেশি কয়েক ব্যক্তিকে বিশেষ সম্মাননা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কয়েকজনকে সম্মাননা দেওয়াও হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি নামগুলো যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে। এই বিজয় দিবসেও কয়েক ব্যক্তিত্বকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই কাজটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের অনেক আগেই করা উচিত ছিল। কারণ, কয়েকটি পরাশক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচারণ করলেও গোটা বিশ্বের মুক্তিকামী মজলুম মানুষ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন করেছিলেন। যার যার সাধ্য অনুযায়ী, সহযোগিতা করেছিলেন।

প্রতিবেশী ভারতের কৃষক-শ্রমিক-জনতা তাদের সিনেমা দেখার টিকেট থেকে শুরু করে অনেক সেবাখাতের সঙ্গে অতিরিক্ত কর প্রদান করে বাংলাদেশের কোটি কোটি শরণার্থীকে সাহায্যে এগিয়ে এসেছিলেন।

এমনকি সেই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে `কনসার্ট ফর বাংলাদেশ`-এর আয়োজনে লাখ লাখ ডলারের টিকেট কেটে হাজির হয়েছিলেন মার্কিন নাগরিকরা। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের বিরোধিতা করেছিল।

যারা বাংলাদেশের মানুষের পাশে সেদিন দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের ঋণ কোনো দিন শোধ হবে না। তার পরও বাংলাদেশের মানুষের উচিত সেই বন্ধুদের সম্মাননা জানানো। এই যে সম্মাননা, এর মাধ্যমে মূলত দেশ ও জাতিই সম্মানিত হবে। এই প্রজন্মের সন্তানেরা জানতে পারবে, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস।

রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে যেসব দেশ স্বাধীনতা পেয়েছে, তাদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে খুব কম সময়ে যে হারে গণহত্যা হয়েছে, এর পেছনে নেপথ্য একটা উদ্দেশ্য ছিল। আর সেই উদ্দেশ্য হচ্ছে, এই জাতি যাতে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয়, জাতিকে পঙ্গু করে দিতে সেই পশ্চিমা পাকিস্তানি হায়েনারা ব্যবহার করেছিল এদেশীয় দোসরদের। পশ্চিমা খান সেনারা যখন দেখেছিল, তাদের আত্মসমর্পণ অনিবার্য, তখন তারা পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছিল এদেশের শ্রেষ্ঠসন্তান বুদ্ধিজীবীদের।

সেই দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে এখনও বেঁচে আছেন শহীদ পরিবারের সন্তানেরা। একজন শহীদের সন্তান, এদেশের দুই কৃতি শিল্পী সাদী মহম্মদ কিংবা শিবলী মহম্মদ যখন বলেন, `চোখের সামনেই পড়ে থাকতে দেখলাম, বাবার নিথর দেহ।’ তখন গোটা জাতিকেই আবারও আঁতকে উঠতে হয়!

কিন্তু খুবই দুঃখের কথা হচ্ছে, সেই সব ঘাতক রাজাকার চক্র এখনও কিন্তু বসে নেই।  বিজয়ের পর বার বার তারা খোলস পাল্টে এখনও জাতিকে ছোবল দিতে চাইছে। জাতি এখনও তাকিয়ে দেখছে, তথাকথিত ধর্মীয় চেতনার নামে এই বিজয়ের মাসেই দেশে হরতাল ডেকেছে একটি চক্র।

এরা কারা? এদের আসল পরিচয় কী? একাত্তরে তাদের ভূমিকা কেমন ছিল? এসব বিষয় খুব স্পষ্টভাবে জাতির সামনে উন্মোচিত হওয়া দরকার। যারা বাংলাদেশের অস্তিত্বই স্বীকার করতে চায়নি, তারা এখন দেশের `সার্বভৌমত্ব` নিয়ে শঙ্কিত! কেমন আজব ফাঁদ পেতে রাষ্ট্রের মানুষকে প্রতারিত করতে চাইছে তারা! যারা একাত্তরে এই মাটিতে দাঁড়িয়ে বলেছিল, `ভারত`- এই দেশ দখল করে নেবে। সেই শক্তিই ৪১ বছর পর একই কথা বলছে। অথচ ধর্মীয় লেবাসধারী এসব আগ্রাসী শক্তিই বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে জঙ্গিবাদী সংগঠন। তালেবানি কায়দায় তারাই বাংলাদেশকে বানাতে চাইছে ‘মিনি পাকিস্তান।’

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ প্রমাণ করেছে, এই দেশের গণমানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তির মুখোমুখি দাঁড়াবার শক্তি কোনো প্রশিক্ষিত সৈন্যবাহিনীরও নেই। বাঙালি গেরিলারা সেদিন বীরদর্পেই ঘায়েল করেছিল পাকিবাহিনীর সুসংহত স্থাপনা। সবই সম্ভব হয়েছিল মানুষের ঐক্যের ফসল হিসেবে। বাংলাদেশে বর্তমানে কি সেই ঐক্য প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়েছে?এ প্রশ্ন নানাভাবেই ঘুরে-ফিরে আসছে।

ব্যবসায়ীদের উচিত, যারা হরতালের রাজনীতি করেন, তেমন রাজনীতিকদের সমর্থন না দেওয়া। একটি সেমিনারে এমন মতপ্রকাশ করেছেন, দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিকরা। তারা বলেছেন, ব্যবসায়ীদের দেওয়া অর্থেই রাজনীতিকরা দল পরিচালনা করেন। আবার হরতাল দিয়ে এই ব্যবসায়ীদেরই মারাত্মক ক্ষতিও করেন তারা।

এটা কে না জানেন যে, দেশের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত। শুধু ব্যবসায়ী কেন, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর নিজস্ব সংগঠন রয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ব্যানারে। তার কারণও রয়েছে। দল দুটি ক্ষমতায় গেলে নিজস্ব ঘরানার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাদ দেয়। মূল্যায়ন করে না এমন অতীত ইতিহাস রয়েছে।

উন্নত গণতান্ত্রিক বিশ্বের একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গেলে তার কেবিনেট নিজেদের মানুষ দিয়েই সাজায়। সেটাই নিয়ম। এই কেবিনেট সদস্যরা রাষ্ট্র আর জনগণকে প্রাধান্য দিয়েই কাজ করেন।

কিন্তু বাংলাদেশে সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি বলেই বিভিন্ন পেশাজীবী উন্মুখ হয়ে থাকেন, নিজের মতাদর্শের দল ক্ষমতায় গেলেই লুটেপুটে খাওয়ার। পদ এবং ক্ষমতা পাওয়ার। আর সে কারণেই গেল ৪ দশকে বাংলাদেশে একটি স্থায়ী লুটেরা বাহিনী নিজেদের আসন পাকাপোক্ত করে নিয়েছে, যাদের কাছে রাজনৈতিক আদর্শ বড় নয়, নিজেদের আখের গোছানোই বড় কথা।

প্রাসঙ্গিক হিসেবে বলা দরকার, যেসব রাজাকার এদেশে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে `ঘৃণা দিবস`পালনের আহ্বান জানিয়েছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্ত্রী মিলি রহমান।

বছরের একটি দিন রাজাকারদের প্রতি ‘ঘৃণা দিবস’ পালন করার আহ্বান জানিয়ে মিলি রহমান বলেছিলেন, “স্বাধীনতার পর থেকেই শুনে আসছি, মুক্তিযোদ্ধাদের লিস্ট তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু আমার মনে হয়, যুদ্ধের পরই উচিত ছিল রাজাকারদের লিস্ট তৈরি করা।”

স্বাধীনতার পর যদি সমস্ত রাজাকারদের নামের তালিকা তৈরি করে গ্রামেগঞ্জে সবখানে ছড়িয়ে দেওয়া যেতো, তাদের জঘন্য কার্যকলাপের বিবরণী যদি পত্রপত্রিকায় ছাপা হতো, তাহলে দেশের অবস্থা আজ এমন হতো না। আর রাজাকাররা কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ক্ষমতায় আসতে পারতো না।

নতুন প্রজন্ম শুনছে, দেখছে, জানছে সেইসব চিহ্নিত মানুষগুলোর অবস্থান। কীভাবে বুক টান টান করে গলা উঁচু করে বড় বড় কথা বলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধাপরাধীদের এখনও খুঁজে বের করে তার বিচার হয়। আর এই দেশে যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের বিচার করা তো দূরের কথা, তাদের সংসদে বসানো হয়।

মিলি রহমান বলেছিলেন, “সোনার বাংলা তৈরির স্বপ্নটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য ৭ কোটি বাঙালি যুদ্ধ করেছিল। দক্ষ সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অদক্ষ কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র এমনকি রাস্তার পাশের আধপেটা খাওয়া ভিক্ষুকও সেদিন এক সারিতে দাঁড়িয়ে সমানে লড়েছিলেন। তাদের একটাই চিন্তা ছিল, আর বেশি দেরি নেই, দেশটা স্বাধীন হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। দেশের মানুষ দুবেলা দুমুঠো ভাত খেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে। স্বাধীনতাবিরোধীদের ধরে একজন একজন করে সবার সামনে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিচার করা হবে। কিন্তু, বাস্তবে এর কিছুই হলো না। বেঈমানী করা হলো, ছোপ ছোপ তাজা রক্তের সঙ্গে! বেঈমানী করা হলো মা-বোনদের আর্তচিৎকারের সঙ্গে, মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে। মাফ পেয়ে গেল যুদ্ধাপরাধীরা!”

সত্যিকারের ইতিহাস জানার জন্য নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানান মিলি রহমান। তিনি বলেন, “দেশের যুবসমাজের কাছে একটিই অনুরোধ, তোমরা যে দেশে জন্ম নিয়েছ, সে দেশের ইতিহাস যেমন করুণ, তেমনি গর্বেরও। সঠিক ইতিহাস জানতে চেষ্টা করো। তারপর নিজের বিবেক, বুদ্ধি দিয়ে কাজ করো। অযথা হাত রাঙিও না। এখনও এ দেশে ক্ষেতে লাঙল চালালে যে মাটি ওপরে উঠে আসে, তাতে কত মুক্তিযোদ্ধার রক্ত মিশে একাকার হয়ে আছে, তা কে জানে! এখনও মাটিতে খুব সাবধানে পা ফেলতে ইচ্ছে করে। কী জানি, কে কোথায় বলে ওঠে- আস্তে হাঁটো পথিক! আমি এখানে ঘুমিয়ে আছি।”

খুব দুঃখের কথা, এই রাজাকার শক্তির সঙ্গে আঁতাত করেছিলেন জিয়াউর রহমানের
দল বিএনপি। তার দল, তাদের আদর্শ মুচলেকা দিয়েছে, সেই পরাজিত রাজাকার শক্তির কাছে, যারা এখনও মহান বিজয়কে মেনে নিতে পারেনি।

তাই, বিজয়ের শত্রুপক্ষ কে, তা প্রজন্মকে জানতে হবে, চিনতে হবে। যারা মুখে মুক্তিযুদ্ধের কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে মুখোশ পরে আছে, তাদের স্বরূপ উন্মোচিত হওয়া খুবই জরুরি।

বাংলাদেশে যারা রাজনৈতিক ঐক্য-সংহতির কথা বলেন, তাদের ভাবতে হবে, সংহতি কার স্বার্থে হবে! কারা ধারণ করবে ভালোবাসার বাংলাদেশের পতাকা! আর কারা এই দেশকে জঙ্গিবাদীদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছে এবং চাইবে। উদাহরণ তো আর কম তৈরি হয়নি! ২০০১ থেকে ২০০৫ সময়ে বাংলাদেশে কী ঘটেছে, তা কারও অজানা নয়।

আমি বিশ্বাস করি, এদেশের মানুষ, আজকের প্রজন্ম- মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়েই এগিয়ে যাবে। তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত করবেই, যে স্বপ্নটি প্রতিক্ষণ দেখতেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।

নিউজরুম

শেয়ার করুন