জামায়াতের হরতালে দেশব্যাপী বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, গুলিবিদ্ধ ১

0
204
Print Friendly, PDF & Email

রুপসীবাংলা, ঢাকা (০৪ ডিসেম্বর) : জামায়াতের ডাকা দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতালে মোটামুটি স্বাভাবিক রয়েছে জামায়াতের এলাকা হিসেবে পরিচিত রাজধানীর মৌচাক, মগবাজার, কাকরাইল এলাকা। তবে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জামায়াত-শিবির কর্মীরা শান্তিনগর মোড়ে বাস ভাঙচুর করে। সেখান থেকে তিনজনকে আটকও করেছে পুলিশ।

এছাড়া রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও, ফার্মগেট, বাংলামোটর ইত্যাদি এলাকায় পুলিশের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা, ঝটিকা মিছিল, গাড়ি ভাঙচুর ও গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও লাঠিচার্জও করেছে পুলিশ।

আর ঢাকার বাইরে কোথাও কোথাও হরতাল সমর্থকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা  ধাওয়া, বাসে আগুন ও টায়ার জ্বালানো ছাড়াও পুলিশের লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটেছে। এজজন গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবরও এসেছে সিলেট থেকে।

বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের পাশাপাশি আছে আহত ও আটকের ঘটনাও। গুরুত্বপূর্ণ সব পয়েন্টেই সতর্ক রয়েছে ৠাব-পুলিশ-সাদা পোশাকের গোয়েন্দারা। কোথাও কোথাও ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে হরতাল বিরোধী মিছিল করতেও দেখা গেছে।

এদিকে ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও দূরপাল্লার কোন বাস ঢাকা থেকে ছাড়েনি। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে।

এদিকে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের উভয় পাশে অবস্থান নিয়েছে পুলিশ।

সকাল ৮টার দিকে মহাখালী এলাকায় শাহীন কলেজের সামনে বাসে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা। তারা একটি যাত্রীবাহী চলন্ত বাসে পেট্রোল ছুঁড়ে দেয়। পরবর্তীতে হরতাল সমর্থকরা ওই বাসে আগুন ছুঁড়লে বাসের একটি সিটে আগুন লেগে যায়। এ সময় যাত্রীরা দ্রুত আগুন নিভিয়ে নেয়। তবে এই ঘটনায় পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি।

এদিকে হরতাল বিরোধী মিছিল-সমাবেশ করেছে তিতুমীর কলেজ শাখা ছাত্রলীগ। তিতুমীর কলেজের ছাত্রলীগ নেতা ছিমছং মিত্রচার্লসের নেতৃত্বে মিছিলটি তিতুমীর কলেজের আশপাশের এলাকা প্রদক্ষিণ করে তিতুমীর কলেজের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করে।

যাত্রাবাড়ী এলাকায় হরতাল সমর্থনে পিকেটাররা ১০/১৫টি গাড়ি ভাঙচুর করে। এছাড়া তারা পুলিশের  টহল গাড়িতে ইট-পাটকেল ছোঁড়ে।  এসময় পুলিশের সঙ্গে তাদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। রাস্তায় টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে দেয় তারা। তবে পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি।

এর আগে খিলগাঁওয়ে পুলিশ-পিকেটার সংঘর্ষে চারজন পুলিশ সদস্য আহত হন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জামায়াত-শিবির কর্মীরা শান্তিনগর মোড়ে বাস ভাঙচুর করে। এ সময় পুলিশ তিনজন জামায়াত-শিবির কর্মীকে আটক করে। এ ঘটনার পর আতঙ্কে আশপাশের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়।

সংঘর্ষের একপর্যায়ে আত্মরক্ষার্থে গুলি ছোঁড়ে পুলিশ। তখন দ্রুত স্থান ত্যাগ করে জামায়াত-শিবিরের পিকেটাররা। সংঘর্ষ চলাকালে পিকেটাররা যাত্রীসহ একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়।

সংঘর্ষের পর পরই ওই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

ভোরে রাজধানীর হোটেল রূপসীবাংলার(শেরাটন) সামনে একটি গাড়িতে ভাঙচুর চালায় পিকেটাররা। বাংলমোটরের কাছে আগুন দেয় টায়ারে।এর আগে ফার্মগেটে কয়েকজন টি শার্ট পরা যুবক টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

পুরনো ঢাকার কোতোয়ালী, সদরঘাট, বাংলাবাজার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, সূত্রাপুর, চকবাজার, বাবুবাজারসহ আশপাশের এলাকায় হরতালের সমর্থনে কোনো তৎপরতা লক্ষ করা যায়নি।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় গেটে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে দেখা গেছে।

সকাল সাড়ে সাতটায় রাজধানীর ধানমণ্ডির ৩২ নাম্বারে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকে শুরু করে হরতালের প্রতিবাদে ছাত্রলীগের একটি মিছিল শুক্রাবাদ, কলাবাগান ঘুরে আবার বঙ্গবন্ধু স্মৃতিস্তম্ভে এসে শেষ হয়।

অন্যদিকে জামায়াত-শিবিরে নৈরাজ্যের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করে ভাষানটেক থানা যুবলীগ। এ সময় ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে সংগীত পরিবেশন এবং স্লোগানের মধ্যে দিয়ে বিক্ষোভ ও সমাবেশ পালন করা হয়।

সদরঘাট বিআইডব্লিওটিএ’র ট্র্যাফিক ইনচার্জ আলমগীর হোসেন জানান, নৌ যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। সকাল ৮টা পর্যন্ত ৫টি লঞ্চ ছেড়ে গেছে। ঘাটে আছে ৩৮টি লঞ্চ।

ঢাকার বাইরে রাজশাহীতে ২ জন, সিলেটে ৪ জন ও চট্টগ্রাম ১ জন আটকের খবর পাওয়া গেছে।

এছাড়া রাজশাহী, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। পাওয়া গেছে সংঘর্ষের খবরও।

বাংলানিউজের সাভারের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট ওমর ফারুক জানান, সকাল ৭টার দিকে সাভারে একটি শ্রমিকবাহী বাসে আগুন দেয় জামায়াত কর্মীরা। এসময় আতঙ্কিত হয়ে নামাতে গিয়ে ১০ শ্রমিক আহত হন।

নয়াহাট এলাকায় হরতালের সমর্থনে রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে জামায়াত সমর্থকরা। এসময় তারা বেশ কয়েকটি যানবাহনে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে।

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি তানভীর আহমেদ জানান, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সিদ্ধিরগঞ্জে ভোরে প্রায় ১ ঘণ্টা তাণ্ডব চালানোর পর পিছু হটে হরতাল আহ্বান করা জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীরা।

ভোর সাড়ে ৬টা থেকে জামায়াত ও শিবিরের কয়েক শ’ নেতাকর্মী ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাক ও ছানারপাড় এলাকায় অবস্থান নেয়। তারা কয়েকটি স্পটে টায়ারে আগুন ধরিয়ে দেয় ও কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করে।

এ সময় পুলিশের সামনেই জামায়াত নেতাকর্মীরা সড়কে মিছিল করে। পরে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে এলে নেতাকর্মীরা পিছু হটে।

জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীদের অবস্থানের কারণে ভোর সাড়ে ৬টা হতে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে।

একই সময়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন মিয়ার নেতৃত্বে একটি মিছিল বের হয়।

সিলেটের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট সাব্বির আহমেদ জানান,  জামায়াত-শিবিরের ব্যাপক তাণ্ডব চালানোর খবর পাওয়া গেছে।

দক্ষিণ সুরমা চণ্ডীপুর, তারানা সিএনজি স্টেশন ও রেলস্টেশন এলাকায় ১৫ থেকে ২০টি গাড়ি ভাঙচুর ও ২টি মোটরসাইকেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় তারা।

এ সময় পুলিশ মহানগর শিবিরের ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক সেলিম আহমদসহ ৪ জনকে আটক করে।

ভাঙচুর ও পিকেটিংয়ে ব্যবহৃত ২টি মোটরসাইকেলও আটক করে পুলিশ।

পিকেটারদের লক্ষ করে ২০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোঁড়ে পুলিশ। এতে একজন গুলিবিদ্ধ হন।

এ সময় তারা একটি পুলিশ ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
টঙ্গিতে ৩টি বাসে অগ্নিসংযোগের চেষ্টার ঘটনায় ২ জনকে আটক করেছে পুলিশ।

গাজীপুর প্রতিনিধি রিপন আনসারি জানান, সকাল সাড়ে ৬টার দিকে টঙ্গির হোসেন মার্কেট এলাকায় হরতাল সমর্থকরা একটি মিছিল করে। এসময় তারা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের হোসেন মার্কেট এলকায় বেশ কয়েকটি টায়ারে আগুন ধরিয়ে দেয়। হরতালকারীরা চলন্ত বাসকে লক্ষ্য করে অগ্নিদগ্ধ টায়ার নিক্ষেপ করে বাসে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা টালায়। এই ঘটনায় পুলিশ সে স্থান থেকে ২হরতাল সমর্থককে আটক করে।

রাজশাহীর স্টাফ করেসপন্ডেন্ট শরীফ সুমন জানান, সকাল ৭টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে বিনোদপুর এলাকায় হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করাকে কেন্দ্র করে শিবিরের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুঁড়লে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছু হটে।

ভোরে নগরীর বন্দর ভবনের সামনে পরিত্যক্ত কার্টন এবং টায়ারে আগুন দেয় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা।
 
পরে পৌনে আটটার দিকে নগরীর পাখলিয়া থানার নতুন ব্রিজ এলাকায় হরতাল সমর্থক পিকেটাররা চারটি যানবাহন ভাঙচুর করে। এসময় পুলিশ এক শিবির কর্মীকে আটক করে।

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি শরীফ বিশ্বাস জানান, কুষ্টিয়ায় হরতালের পক্ষে রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করা হয়।

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল জানান, সাতক্ষীরায় হরতালে জামায়াত-শিবির কয়েক দফা ঝটিকা মিছিল করে। পিকেটাররা প্রধান প্রধান রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ এবং শহরের পুরাতন সাতক্ষীরা এলাকায় একটি গাড়ি ভাঙচুর করে।

পরে পুলিশ রাস্তা থেকে গাছের গুঁড়ি সরিয়ে দেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবির কর্মীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

এ সময় শহরের বিভিন্নস্থান থেকে জামায়াত-শিবিরের ৬ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ।

ভোলা প্রতিনিধি ছোটন সাহা জানান, সকালের দিকে পিকেটাররা ভোলা-বরিশাল সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে ও গাছের গুঁড়ি ফেলে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করলেও পুলিশের ধাওয়ায় সটকে পড়ে পিকেটাররা।
ভোরে জেলা সদর ও দৌলতখান উপজেলা থেকে জামায়াতের ২ কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। এরা  হলেন- নুরে আলম (৩২) ও মোস্তাফিজুর রহমান (২৮)।

নিউজরুম

শেয়ার করুন