দেখার কেউ নেই— নওগাঁর রাণীনগরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মফিজ উদ্দিনের সংসার চলে ভিক্ষা করে

0
172
Print Friendly, PDF & Email

 

নিজস্ব প্রতিবেদক, নওগাঁ (২৮ নভেম্বর): দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত নওগাঁর রাণীনগরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মফিজ উদ্দিন (৭২) এখন ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

 

স্ত্রী, নাবালক ছেলে আর দুই নাতিসহ স্বামী পরিত্যক্তা এক মেয়েকে নিয়ে তার বড় সংসার আর চলেনা। সরকারী সহযোগিতার জন্য তিনি বার বার বিভিন্ন মহলে ধর্ণা দিলেও তার কথায় কর্ণপাত করেনি কেউ। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা তো দূরের কথা, বয়স্ক ভাতাও জোটেনি তার কপালে। পক্ষাঘাতে অসুস্থ মফিজ একদিন ভিক্ষায় বেরুতে না পারলে অভুক্তই থাকতে হয় সারা দিন সংসারের সবাইকে। চিকিৎসার অভাবে প্রায়ই রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখা যায় তাঁকে। পেশায় তাঁত কর্মচারী উপজেলার চককুতুব গ্রামের মৃত ডোমন আলী মন্ডলের  ছেলে মোঃ মফিজ উদ্দিন মন্ডলকে হানাদার বাহিনী তার বাড়ী থেকে ধরে নিয়ে আদমদিঘী উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া ক্যাম্পে নিয়ে যায়।

 

সেখানে তার হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে রেল ব্রীজ পাহারাদারের কাজ দেয়। কিন্তু দেশপ্রেমিক মফিজ সুযোগ বুঝে সে অস্ত্র নিয়ে জীবনের ঝুকি নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে আসেন। এরপর তিনি তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত নওগাঁ সদর উপজেলার চুনিয়াগাড়ী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা অছির উদ্দীনের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। মুক্তিযোদ্ধা মফিজ উদ্দীন জানান, তিনি ভারতের মধুপুর ও বাঙ্গালপুর ক্যাম্পে প্রশিক্ষন নিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে যারা প্রশিক্ষন নিয়েছেন তারা হলেন, উপজেলার মুনিরুজ্জামান, আব্দুস ছামাদ মন্ডল, মীর হোসেন মাষ্টার, শামসুর রহমান শ্যাম, ইয়ার আলী প্রমুখ।

 

প্রশিক্ষন শেষে মফিজ উদ্দীন ৭নং সেক্টরে নওগাঁ বালুডাঙ্গা ক্যাম্পের অধীনে যুদ্ধ করেন। পাক হানাদার বাহিনী তাঁর ঘর-বাড়ী আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। যুদ্ধ শেষে তিনি মোহাম্মাদ আলীর বাড়ীতে আবার তাঁত কর্মচারি হিসাবে কাজ শুরু করেন। ১৯৮৮ সালের পূর্ব পর্যন্ত তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নামে আসা সরকারী সকল অনুদান পেয়েছেন। ১৯৮৮ সালের বন্যার পানিতে ঘর-বাড়ী ডুবে তার মুক্তিযোদ্ধার সকল কাগজ পত্র বিনষ্ট হয়। যুদ্ধ-পরবর্তী কাগজ পত্রাদি বের করলে তার নাম সেই তালিকায় পাওয়া যাবে বলেও তিনি জানান। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তার মত অনেক মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন যাদের কোন কাগজ পত্রাদি সংরক্ষিত নেই, তবুও তারা নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আবার নতুন ভাবে কাগজপত্র তৈরী করে মুক্তিযোদ্ধার সকল সুবিধা ভোগ করছেন। মফিজ উদ্দিন গরীব মানুষ, টাকা পয়সা নেই বলে কোথাও গিয়ে ফল পাননা। চলতি বছরের শুরুতেই তিনি নতুন করে আবেদন করেছেন- যার সিরিয়াল নাম্বার ৩১০।

 

মুক্তিযোদ্ধা মফিজ উদ্দিন ১৯৯২ সালে পক্ষাঘাতে আক্রান্তত হলে কাজকর্ম করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেন। জীবিকার প্রয়োজনে তিনি অসুস্থ শরীর নিয়ে ভিক্ষা বৃত্তি শুরু করেন। বয়সের ভারে নুজু শরীরে চলাফেরাও করতে পারেন না। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধার ভাতা না পেলে পরিবার পরিজন নিয়ে অনাহারে মরতে হবে। স্ত্রী, ১১ বছর বয়সের ১ ছেলে ও ৩ টি মেয়ে রয়েছে তাঁর। ৩ মেয়ের অনেক কষ্ট করে বিয়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে ২য় মেয়ে স্বামী পরিত্যাক্ত হয়ে ২টি সন্তান সহ তাঁর সংসারেই রয়েছে। এ ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান, আব্দুস ছামাদ মন্ডল, ইয়ার আলী ফকির ও শামসুর রহমান শ্যামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা সবাই জানান যে মফিজ উদ্দীন সত্যি সত্যিই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং তাঁর এক সঙ্গেই ভারতের মধুপুর ও বাঙ্গালপুর ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

 

এ ব্যাপারে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এ্যাড: ইসমাইল হোসেন জানান, মফিজ উদ্দিনের আবেদন পত্র জমা আছে। চূড়ান্ত বাছাইয়ের পর তিনি যদি মুক্তিযোদ্ধা হয়ে থাকেন তাহলে টিকবে আর যদি মুক্তিযোদ্ধা না হয়ে থাকেন তাহলে কোন প্রশ্নই আসে না।

 

 

 

প্রতিবেদক, মোফাজ্জল হোসেন, সম্পাদনা আলীরাজ/ রাফি, নিউজরুম

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

শেয়ার করুন