‘ফেলানী ঝুলছে না, ঝুলছে বাংলাদেশ’

0
205
Print Friendly, PDF & Email

রুপসীবাংলা, কুড়িগ্রাম (১৯ নভেম্বর): ভোররাতে হঠা করেই চিকার শুরু হলেঘর থেকে বের হয়ে কুয়াশা ছাড়া আর কিছু চোখে পড়লো নাকিন্তু সকাল হলে, কুয়াশা আস্তে আস্তে সরে গেলে, সাড়ে সাত অথবা আটটার দিকে দেখি কাঁটাতারেরবেড়ায় ফেলানী ঝুলে আছেততোক্ষণে এখানে স্থানীয় মানুষ, বিডিআর, এই পারেরপুলিশ এসে ভয়াবহ অবস্থাতবে ফেলানী মারা যাবার আগে পানি পানি বলেখুব চিকার করছিল, কিন্তু কে তারে ওখানে পানি দিতে যাইবো, যে যাইবো তারেইমাইরা ফেলবো বিএসএফআর ফেলানীর বাবার অবস্থাও খুব ভালো ছিল না, কাঁটাতারেরআঘাতে সেও রক্তাক্ত ছিল, কিছু দূর দৌড়ে আসার পর অজ্ঞান হয়ে যায়

পরে তারেআমরা সুস্থ করে তুলিফেলানী ঝুলছে না, ঝুলছে বাংলাদেশসেইফেলানীর রক্তাক্ত মৃতদেহ কাছ থেকে দেখেছেন ৮০ বছরের বৃদ্ধ মো. আকবর আলীসেদিনের কথা জিজ্ঞেস করলে এভাবেই তিনি এসব কথা বললেনতিনি আরও বলেন, প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা পর সকাল ১১টার দিকে ফেলানীর লাশ নামিয়ে নিয়ে যায় বিএসএফ
এ প্রতিবেদক যেখানে দাঁড়িয়ে মো. আকবর আলীর সঙ্গে কথা বলেছেন সেখান থেকেফেলানী যেখানে ঝুলে ছিল সেই কাঁটাতারের বেড়ার দূরত্ব মাত্র ১৫০ গজতাই খুবকাছ থেকেই দেখা যাচ্ছিল কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে বিএসএফক্যাম্পনির্দিষ্ট সময় পরপর একাধিক বিএসএফ জওয়ান আসছিলো সেখানেসেখান থেকে ফেলানীরবাড়ি গিয়ে কথা হয় ফেলানীর বাবা এবং মায়ের সঙ্গে

আল্লাহ তুমিআমার মেয়েটারে দেখো বলেই দৌড় দেই আমিতারপর আমি অজ্ঞান হয়ে যাই’- বলেনফেলানীর বাবা নুরুল ইসলামমেয়েকে হারানোর কথা বলতে গিয়ে মনের বাঁধ, চোখেরবাঁধ সব ভেঙ্গে যায়চোখের কোণে দেখা যায় সরু অশ্রুরেখাবাবার আকুলতাছুঁয়ে যায় সবাইকেসবাই বাকহারা, সবার চোখেই পানির ধারাবাবা বলেচলেন, অনেক ছোট বেলায় আসাম গিয়ে সেখানেই থাকতে শুরু করিবনগাইগঞ্জ গ্রামেদোকান করতামকিন্তু সেখানে আর বেশিদিন থাকার ইচ্ছা ছিল নানিজ দেশেই ফিরেআসার আশায় সেখানে মেয়েটাকে বিয়ে না দিয়ে ওর খালাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে ঠিককরি৮ জানুয়ারি ছিল ওর বিয়ের তারিখ৬ তারিখ সকালে রওনা দিয়েসীমান্তে পৌঁছাই সন্ধ্যায়দালালের মাধ্যমে সীমান্ত পার হতে হয়সেদিনসন্ধ্যা থেকেই পার হওয়ার জন্য সুযোগ খুঁজি, কিন্তু পাই নাইভোর বেলা দালালআমাদেরকে পার হতে বলেকাঁটাতারের বেড়ার পিলারের ওপরে উঠি মেয়েকে নিয়েআমার এক হাতে মেয়ে আরেক হাতে মেয়ের বিয়ের জিনিসপত্রহঠা গুলির শব্দ

১৫থেকে ২০ গজ কাছ থেকে আমার ফেলানীকে গুলি করে বিএসএফএবার মেয়ে হারানোবাবা শব্দ করে কেঁদে উঠেনসেই সঙ্গে ডুকরে কেঁদে ওঠেন সেখানে উপস্থিতফেলানীর মাবাবা বলে যান, “আমি দেখছি বিএসএফ বসা ছিলকিন্তুআমাদের সাথে তো দালাল ছিলদালালরে গুলি না করে আমাদের গুলি করেতাকিয়েদেখি মেয়েটা আমার পিলারের ওপর দাঁড়ানো গুলিবিদ্ধ অবস্থায়আর আমি হঠাকাঁটাতারের বেড়ার এপাশে চলে যাইআমি নিজেও তারের আঘাত পাইশরীরে রক্তঝরে

ফেলানীর মায়ের দিকে তাকাতেই তিনি বলেন, ‘মেয়ে আমার খুব সুন্দর ছিলভারতে সবাই বলতো, মেয়েকে সেখানে বিয়ে দিতেকিন্তু সেটা চাই নাইমেয়েমারা যাওয়ার ৩ দিন পর আমি খবর পাইএখানে আসি ৪১ দিন পরভারতে যেখানেথাকতাম, সেখানে কান্নাকাটিও করতে পারতাম না, আমরা যে বাংলাদেশি সেটাতো বলাযায় নাযদি কাঁদি তাহলে লোকজন জানবে, পুলিশ আমাদের আটক করবে

আমারবড় মেয়ে ফেলানীসামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ওর জন্য বিয়ের কেনা কাটা করেছিযখন চলে আসে তখন ওর সাথে ২২ ভরি রূপা, দেড় ভরি স্বর্ণ আর ৮০ হাজার টাকাছিলকিন্তু এগুলোর কিছুই বিএসএফ পরে ফেরত দেয় নাই
ফেলানীর মাবলেন, ‘মাইয়া মারা যাওয়ার পর সাহারা খাতুন (তকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী)এসেছিলেনতিনি বলেছিলেন, ফেলানীর কবর পাকা করবো, বাড়ির সামনের রাস্তা পাকাকইরা নাম দিবো ফেলানী রাস্তা, ফেলানীর মৃত্যুবার্ষিকী পালন করবো প্রতিবছর, বাচ্চাদের লেখাপড়া, ভরণ-পোষণের ভার নিবোকিন্তু কিছুই করে নাইএতোক্ষণেরদুঃখ যেন ক্ষোভে রূপান্তরিত হয় ফেলানীর মায়েরতিনি বলেন, ‘সাহারা খাতুননিজে এসব বলেছেন, তার বলা যেই কথা, আর রাস্তা হওয়াতো একই কথাসরকার মানুষহইয়া যে এতো মিথ্যা কথা কয়! যদি মন্ত্রীর সাথে দেখা হইতো, হেরে আমি কিছুকথা কইতামবাংলাদেশের নাগরিক হইয়া সরকারের থেকে কোন ক্ষতিপূরণ পাই নাই

তবেফেলানীর মৃত্যুর পর জেলাপ্রশাসন থেকে বাজারে কিছু জমি আর বিজিবির পক্ষথেকে দোকান ঘর তুলে দেওয়া হয়েছে আর ৩ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে পরিবারকেসেইটাকা দিয়ে দোকানের মালামাল ও পাওনা দিয়েছেন তারাদুঃখিনী মাকেযেন কথায় পেয়ে বসেছেতিনি বলে চলেন, ‘ভারতে বাচ্চা নিয়ে সমস্যা ছিল না, ভোট দিতে পারতাম না সেখানে, আইডি কার্ড পর্যন্ত ছিল না কিন্তু ঐখানে আরামেছিলামঐখানে ব্যবসা করলে ভালো আয় হতো, কিন্তু এখানে আয়ও নাই, সরকারও কোনসাহায্যও করে নাভারতে বাচ্চাদের কেজি স্কুলে পড়াইছি আর নিজ দেশে সরকারিস্কুলেও পড়াইতে পারি নাতাইলে তো ভিন দেশেই ভালো ছিলাম

গত বার, ফেলানীর মৃত্যুদিবসের আগে কতো জনের কাছে গেলাম, ডিসি সাহেবের কাছে গেলাম, বলেন ফান্ড নাই, তারপর খালি ঘুরাইলেন কিন্তু টাকা দিলেন নাকিন্তু আমরা তোমা বাপ, আমরা তো ভুলতে পারি না’, বলেন ফেলানীর বাবা
ফেলানীরবাড়িতে থাকতে থাকতেই জানা গেল আরেকটি তথ্যবাংলাদেশে যখন ফেলানীরপোস্টমর্টেম হয় তখন তিন সদস্যের সেই টিমের একজন, ডা অজয় কুমার বলেছিলেন,  ‘ফেলানীকে যদি সঙ্গে সঙ্গে কাঁটাতার থেকে নামানো যেত তাহলে তাকে বাঁচানোযেতোযখন চলে আসি তখন কানে কাছে ফেলানীর মায়ের কথা, ‘একটা কবরেরজন্য এখন কতোগুলি মানুষ কষ্ট করছেকবরটারে একলা রাইখ্যা তো আর যাওন যাইবোনা

 

নিউজরুম

শেয়ার করুন