রাবিতে শিবির আতঙ্কে ছাত্রলীগের নিরাপত্তায়, ক্যাম্পাসে পুলিশ মোতায়েন

0
92
Print Friendly, PDF & Email

এরশাদুল বারী কর্ণেল, রাবি (১১ নভেম্বর): বর্তমান মহাজোট সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বায়ত্ত্বশাসিত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় গত ৪২ মাস ধরে জরুরী অবস্থার মধ্যেই চলছে। ২০০৯ সালের ১৩ মার্চ ছাত্রলীগ-শিবির সংঘর্ষে শিবিরের সাধারণ সম্পাদক নিহতের পর ক্যাম্পাসে শিক্ষার সূষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার কথা বলে ওই বছরের ১৫ মে সিন্ডিকেটে আইন করে এ জরুরী অবস্থা জারি করেন বর্তমান ভিসি প্রফেসর এম আব্দুস সোবহানের নেতৃত্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন্।

 

ওই সিন্ডিকেটে প্রশাসনের পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাসে মিছিল-মিটিং, সভা-সমাবেশ, পোস্টার-ব্যানার টাঙ্গানো, রাতে হলের বাইরে বের না হওয়া, সব ধরণের রাজনৈতিক কর্মকান্ডের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এমনকি পরবর্তীতে দুপুর ২টার পর ছাত্রীদের হলের বাইরে যাওয়ার উপরেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে প্রশাসন।

 

সর্বশেষ গত শনিবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাস ও পাশ্ববর্তী এলাকাগুলোতে মাইকিং করে শিক্ষার্থীদেরকে সতর্ক থাকা, রাতে হলের বাইরে না যাওয়া ও দোকান-পাট বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়। প্রশাসন বলছে, এখনও এ জরুরী অবস্থা তুলে নেয়ার মতো সময় আসেনি।তাছাড়া দীর্ঘদিন থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের আধিপত্য থাকায় শিবির আতংকে ওই ঘটনার পর থেকেই ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিকভাবে ক্যাম্পাসের অন্তত ২৩টি স্পটে সাড়ে তিন শতাধিক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। প্রতিদিন দিন-রাতে শিফট করে এ পুলিশ সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। তবে ১১টি আবাসিক হলসহ ক্যাম্পাসের ২৩টি স্পটে এই বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য থাকলেও তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে পারছেনা বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ।

 

পুলিশের সামনেই প্রতিদিন ক্যাম্পাস ও আবাসিক হলগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর ও হল থেকে বের করে দেয়া হলেও পুলিশ এক্ষেত্রে নিরব ভূমিকা পালন করছে বলে তাদের অভিযোগ। ছাত্রলীগের মারধর ও আতংকে এ সময়ের মধ্যে অন্ততপক্ষে পাঁচ শতাধিক সাধারণ শিক্ষার্থী হল ছেড়েছে। রাজশাহী পূর্ব জোনের উপ পুলিশ কমিশনার শাহ গোলাম মাহমুদ বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য ক্যাম্পাসকে ২৩টি স্পটে ভাগ করে প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। তারা শিফট করে এ দায়িত্ব পালন করছেন। এত পুলিশ সদস্য থাকার পরেও প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের মারধর ও হল থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে এক্ষেত্রে পুলিশ কোন ভূমিকা রাখতে পারছেনা কেন এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কেউ পড়াশোনা করে ঘরের মধ্যে মারামারি করলে আমাদের কি করার আছে ? ঘরের মধ্যে নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব আমাদের না। এটা সম্ভব না।তবে বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর অভিযোগ, জরুরী অবস্থার নামে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে প্রশাসনের এ নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর জন্যই কার্যকর আছে। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ক্যাম্পাসে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ মিছিল-মিটিংসহ সব ধরণের কার্যক্রম বিনা বাধায় পরিচালনা করলেও ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে মিছিল করতে চাইলে তাদেরকে বাধা দেয়া এমনকি পুলিশ ও সরকার দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে তাদের ও্পর হামলা চালানো হয়েছে গত সাড়ে তিন বছরে একাধিকবার। তাছাড়া এ সময়ের ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দুই কর্মী নিহত, শিবিরের সাথে সংঘর্ষে এক ছাত্রলীগ কর্মীসহ বর্তমান প্রশাসনের আমলে ক্যাম্পাসে চারটি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে।

 

ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে অন্ততপক্ষে শতাধিকবার। এসব হত্যাকান্ড ও সংঘর্ষের ঘটনায় প্রশাসন দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও ব্যর্থ হয়েছেন।ছাত্রদলের আহবায়ক আরাফাত রেজা আশিক স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনের জরুরী অবস্থা জারির বিরোধীতা করে বলেন, মূলত প্রশাসন শুধুমাত্র একটি দলকে তাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করার জন্যই এ নিষোধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ছাত্রলীগ ছাড়া আমরা ক্যাম্পাসে কোন কর্মসূচী পালন করতে গেলেই সিন্ডিকেটের ওই নিষেধাজ্ঞার কথা বলে বাধা প্রদান করেছে।

 

ছাত্রশিবিরের সভাপতি আফরাফুল আলম ইমন বলেন, রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার কথা বলে প্রশাসন ক্যাম্পাসে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করে শুধুমাত্র ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের নিরাপত্তার দিচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন মারধর ও আবাসিক হল থেকে বের করে দেয়া হলেও পুলিশ ও প্রশাসন কোন ভূমিকা পালন করছেনা বলেও তিনি অভিযোগ করেন।ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি শিপন আহমেদ বলেন, প্রশাসন গণতন্ত্র ও ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের কথা বলে দীর্ঘদিন ধরে জরুরী অবস্থার মাধ্যমে একদলীয় স্বৈরশাসন চালাচ্ছে। প্রশাসনের এ নিষেধাজ্ঞায় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক-সাংস্কুতিকসহ সব ধরণের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। স্বায়ত্বশানকে অনেক আগেই গলাটিপে ক্যাম্পাসকে পুলিম ক্যাম্প বানিয়ে রেখেছে। তিনি বলেন, এভাবে মৌলবাদ বিরোধী অবস্থান নেয়া যায় না।

 

তিনি অবিলম্বে এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে ছাত্র সংগঠনগুলোকে তাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করতে দেয়াও দাবি জানান।ক্যাম্পাসের জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার করা হবে কিনা এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর এম আব্দুস সোবহানের মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

 

একই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রোভিসি প্রফেসর মুহম্মদ নুরুল্লাহ বলেন, সেই জরুরী অবস্থা এখনও বলবৎ আছে। ওই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার কোন চিন্তা-ভাবনা করছেন কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এখনও সেরকম পরিস্থিতি আসেনি। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিই দিতে পারবেন বলে তিনি জানান। #

 

 

 

সম্পাদনা, আলীরাজ/ রাফি, নিউজরুম

 

শেয়ার করুন