আরাফাতের ময়দানে সমবেত লাখ লাখ কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক

0
123
Print Friendly, PDF & Email

রুপসীবাংলা, ডেস্ক ঢাকা :
আজ পবিত্র হজ। বিশ্ব মুসলিমের মহামিলনের দিন । হিজরি ৮ জিলহজ সৌদি আরবে আরাফাতের ময়দানে সমবেত লাখ লাখ কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ আমি হাজির তোমার দরবারে’। আরাফাতের ময়দানে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করার নামই হজ। এর আগে-পরে অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ করার মাধ্যমে হজের পরিপূর্ণতা দেওয়া হয়।
শুভ্র সেলাইবিহীন এক কাপড়ে সবাই হাজির হয়েছেন মহান আল্লাহর দরবারে তার নৈকট্যলাভের আশায়। লাখ লাখ মানুষের পদচারণা আর হাজার হাজার তাঁবুতে পরিপূর্ণ মিনা এখন মানুষ আর তাঁবুর শহর। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা প্রায় তিরিশ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমানের স্রোত এসে মিশেছে মহানবীর (সা.) বিদায় ভাষণের স্মৃতিবিজড়িত আরাফাতে। মিনায় ফজরের নামাজ আদায় করেই “লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক “ ধ্বনিতে হজযাত্রীরা আরাফাতের ময়দানে গিয়ে নিজ নিজ খিমায় আশ্রয় নেন। এখানেই দিনভর এবাদত বন্দেগিতে মশগুল থাকবেন তারা।মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বিত্তশালীদের হজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাজিরা আরাফাতে অবস্থান করার মধ্য দিয়ে পালন করবেন হজের প্রধান আনুষ্ঠানিকতা। মধ্যাহ্নের পর মসজিদে নামিরা থেকে হজের খুতবা দেবেন সৌদি আরবের সর্বোচ্চ মুফতি শেখ আবদুল আজিজ বিন আবদুল্লাহ আল শেখ।
দৃষ্টিশক্তিহীন এ ইমাম তুলে ধরবেন মুসলিম বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি ও কোরআন-হাদিসের আলোকে করণীয় দিকনির্দেশনা। মসজিদে নেমরা থেকে খুতবার শব্দ গোটা আরাফাতে শোনা না গেলে মুসল্লিরা রেডিও এবং টিভির মাধ্যমে শুনবেন গুরুত্বপূর্ণ এ খুতবা। হাজীরা জামাতবদ্ধ হয়ে একই আজানে ভিন্ন ভিন্ন একামতে একসঙ্গে আদায় করবেন জোহর ও আসরের নামাজ।
সূর্যাস্তের পরপরই তারা মুজদালেফার উদ্দেশে ত্যাগ করবেন আরাফাতের ময়দান। মুজদালেফায় পৌঁছে একই সঙ্গে আদায় করবেন মাগরিব ও এশার নামাজ। রাতযাপন করবেন খোলা আকাশের নিচে। শুক্রবার ফজরের নামাজের পর আবার প্রত্যাবর্তন করবেন মিনায় এবং সেখানে শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপ ও কোরবানি আদায়ের মাধ্যমে পরিত্যাগ করবেন ইহরাম। এরপর একে একে মক্কায় কাবা শরিফে গিয়ে ফরজ তাওয়াফ আদায় এবং সাফা মারওয়া পাহাড়ে সায়ি করবেন। ১১ ও ১২ জিলহজ জামারায় শয়তানের প্রতিকৃতিতে কঙ্কর নিক্ষেপ করবেন হাজিরা। এর মধ্য দিয়েই হজের সব কার্যক্রম শেষ হবে।
চলতি বছর সব হাজিদের মিনা থেকে মোজদালেফা, আরাফা ও ফের মিনায় চলাচলের জন্য রেল ভ্রমণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এজন্য সৌদি কর্তৃপক্ষ এবার চালু করেছে মনোরেল সেবা। প্রায় ১৮ কিলোমিটার এ পথে নয়টি স্টেশন (আরাফাতে তিনটি, মুজদালিফায় তিনটি এবং মিনায় তিনটি) রয়েছে। প্রতিটি ট্রেনে রয়েছে ১২টি বগি। একটি ট্রেনে সাড়ে তিন হাজার হাজি যাতায়াত করতে পারবেন। পাঁচ দিনের জন্য প্যাকেজ জনপ্রতি ভাড়া ২৫০ রিয়াল। আগেই সৌদি কর্তৃপক্ষ হাজিদের কাছ থেকে রেলভাড়া আদায় করেছে।
বিশ্বের ১৫০টি দেশ থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের নিরাপত্তার জন্য নেয়া হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আকাশে টহল দিচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনীর সাঁজোয়া হেলিকপ্টার। মাঠে রয়েছে পুলিশ, আর্মি, সেচ্ছাসেবক বাহিনী ও স্কাউট সদস্যরা। অগ্নিনির্বাপণের জন্য প্রস্তুত রয়েছে অত্যাধুনিক সরঞ্জামসংবলিত সিভিল ডিফেন্সের গাড়ি ও হেলিকপ্টার।
হাজিদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য মিনা, মুজদালিফা ও আরাফাতে স্থায়ী হাসপাতাল ছাড়া রয়েছে অসংখ্য ভ্রাম্যমাণ চিকিত্সাকেন্দ্র ও এয়ার অ্যাম্বুলেন্স। হাজিদের অসুবিধা দেখার জন্য রয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কয়েক হাজার কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, হাজিরা জামারায় শয়তানের তিন প্রতিকৃতিতে যাতে নির্বিঘ্নে পাথর নিক্ষেপ করতে পারেন, সেজন্য কয়েক বছর ধরে ও স্থানটির সম্প্রসারণের কাজ হয়েছে। সৌদি গ্রাম ও পৌরবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব হাবিব জয়নাল আবেদিন সাংবাদিকদের জানান, জামারা কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। এখানে তাপমাত্রা থাকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য জামারার ভেতরে একাধিক ক্লোজসার্কিট (সিসি) ক্যামেরা বসানো হয়েছে। রয়েছে পর্যাপ্ত টয়লেট, খাবারের দোকান ও সেলুন। জরুরি প্রয়োজনে হেলিকপ্টার অবতরণের জন্য রয়েছে হেলিপ্যাড। প্রতি ঘণ্টায় তিন লাখ হাজি পাথর নিক্ষেপ করতে পারবেন। পাথর নিক্ষেপের সুবিধায় মিনার পূর্বদিক থেকে আসা হাজিরা আসবেন নিচতলা ও দোতলায়, মক্কা থেকে আসা হাজিরা তৃতীয় তলায়, উত্তর দিক ও মোয়াইসিম থেকে আসা হাজিরা চতুর্থ তলায় এবং আজিজিয়া থেকে আসা হাজিরা পঞ্চম তলায় পাথর নিক্ষেপ করবেন। দুর্ঘটনা এড়াতে ১২টি প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ রয়েছে।
হাজিদের পাথর মারার নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। মোয়াল্লেম নম্বর অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে পাথর মারতে হবে। সৌদি মোয়াচ্ছাসা (হজের সার্বিক বিষয় যারা দেখাশোনা করেন) ১০ জিলহজ সকাল ৬টা থেকে ১০টা পর্যন্ত এবং ১১ থেকে ১৩ জিলহজ সকাল ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত পাথর নিক্ষেপ না করতে হাজিদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।
আরব নিউজ সূত্রমতে, এ বছর প্রায় ৩০ লাখ মুসলমান হজ পালন করছেন। এর মধ্যে বিশ্বের ১৫০টি দেশের ২০ লাখ এবং সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ প্রায় ১০ লাখের মতো হাজি রয়েছেন। এবার বাংলাদেশি হাজির সংখ্যা ১ লাখ ১১ হাজার ২৭৯ জন। এদের মধ্যে মারা গেছেন ৫৯ জন। সৌদি আরবের অভ্যন্তরে বসবাসকারী বিদেশিদের হজের জন্য বিশেষ অনুমতি নিতে হয়। একজন বিদেশি প্রতি ৫ বছরে একবার হজের অনুমতি পেয়ে থাকেন। হজের অনুমোদনবিহীন বিদেশিদের ঠেকানোর জন্য মক্কায় প্রবেশের পথগুলোতে বসানো হয়েছে একাধিক চেকপোস্ট। সৌদির পাসপোর্ট ডিপার্টমেন্টের তথ্য মতে, গত কয়েক দিনে মক্কা ও মদিনার চেকপোস্ট থেকে ৬০ হাজারের মতো হজযাত্রীকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। মক্কা এলাকায় হজের অনুমতিপ্রাপ্ত স্টিকার ছাড়া কোনো গাড়ি প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

আপলোড ২৬ অক্টোবর১২, নিউজরুম

শেয়ার করুন