দেশে এইচআইভি আক্রামত্ম রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ৫’শ

0
190
Print Friendly, PDF & Email

রূপসীবাংলা সাতক্ষীরা :
শ্যামনগরের মেয়ে রাশেদাকে (৩৫, ছদনাম) বিয়ে করে ১৩ বছর আগে ভারতের বোম্বে নিয়ে যান রফিকুল। কিন্তু বোম্বে পৌছানোর ৭ দিনের মাথায় বিক্রি করে দেওয়া হয় রাশেদাকে। যৌন পেশায় বাধ্য করা হয় তাকে।
বছর দশেক পর ২০১০ সালে ভারতের একটি বেসরকারি সংস্থার সাহায্যে দেশে ফেরেন রাশেদা। সঙ্গে ৬ বছর বয়সী ছেলে অমীত। গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন রাশেদা। শরীরের বিভিন্ন অংশে পচনও ধরে। সাতক্ষীরা জেলা হাসপাতালের এইচআইভি সেন্টারে পরীক্ষার জন্যে নিজেই আসেন তিনি। সঙ্গে নিয়ে আসেন অমিতকে। সাতক্ষীরা হাসপাতালের এইচআইবি/এইডস সেবার কাউনিলর সীমা রানী ম-ল প্রাথমিক পরীক্ষা শেষে রাশেদা এবং মহীনের রক্তের স্যাম্পল পরীক্ষার জন্যে খুলনা পাঠান। সেখান থেকে এইচআইভি পজিটিভের তথ্য দেওয়া হয় মা ও ছেলের। সীমা রানী ম-ল জানান, এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে সেপেম্বর পর্যমত্ম এখানে ৬টি পজিটিভ কেস পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে পুরুষ একজন, শিশু একজন এবং বাকি চারজনই নারী।
এইচআইভি পজিটিভে সংক্রমিত পুরুষ বাতেনের (৪৬, ছদণনাম), বৌ রয়েছে ৩ জন। বাতেন এবং তার এক বৌভারতে যৌন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সেই বৌয়ের মাধ্যমেই এইডসে আক্রামত্ম হয় বাতেন। সে বৌ বর্তমানে ভারতেই রয়েছেন। এছাড়াও অন্য ৩ জন নারীর এইচআইভি পজিটিবে সংক্রমণের কারণও ভারতে পাচার হয়ে যাওয়া এবং যৌন ব্যবসা। এদের সবাই বিভিন্ন প্রতারণার ফাঁদে পড়ে বোম্বে ও পুনেতে বিক্রি হয়ে যায়। সেখান থেকেই এইচআইভি বহন করে নিয়ে আসেন। সীমা রানী জানান, অনেক সময় ভারতে ধরা পড়লে সংক্রমিতরা আর দেশে ফিরে আসেন না। সেখানেই চিকিৎসা নেন। তবে সাতক্ষীরায় সব মিলিয়ে এ সংখ্যা শত ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করেন তিনি। খুলনা বিভাগের এইচআইভি প্রাগ্রাম সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরায় এমএসএম (পুরুষ-পুরুষ যৌন সম্পর্ক) এর মাধ্যমেও এইচআইভি সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকতে পারে। কারণ, ভারতে এখন এমএসএম এর সংখ্যা বেড়েছে। এছাড়াও ঝিনাইদহে এরইমধ্যে একটি এমএসএম এর একটি কেস পাওয়া গেছে।
সাতক্ষীরাতেও রয়েছে, তবে এখনো চিহিণত হরা যায়নি। সাতক্ষীরার ১৩৮ কিলোমিটার সীমামত্ম দিয়ে যে নারী পাচার হচ্ছে এবং বিভিন্ন কাজের জন্যে মানুষ ভারত যাচ্ছে তার থেকেই এইডস ছড়াচ্ছে। এখানে ইঞ্জেকটেবল ড্রাগ ইউজারের মাধ্যমে এইডস ছড়ানোর প্রবণতা নেই বলে জানান সীমা রানী। অবৈধপথে সীমামত্মবর্তী দেশে আসা-যাওয়ায় শারীরিক পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না এসব মৌসুমী বা দীর্ঘদিনের জন্যে অভিবাসনে যাওয়া মানুষদের। অভিবাসনে যাওয়া পুরুষদের অনেকেই ভারতে নারী যৌন কর্মীদের সঙ্গে মিলিত হচ্ছেন। তবে ভারতে পুরুষ যৌনকর্মী থেকে বাংলাদেশী নারী বা পুরুষের মথ্যে এইডস ছড়ানোর কোন কেস এখনো পাওয়া যায়নি। কর্মক্ষেত্রে পুরুষদের সঙ্গে পুরুষদের যৌন মিলনের সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে এখান থেকে অভিবাসন হওয়া নারীদের প্রায় সবাই নারী পুরুষ যৌন মিলনের মাধ্যমেই এইডসে আক্রামত্ম হয়েছেন।
ভারতে পাচার হয়ে আবার দেশে ফিরে এসেছেন এ ধরনের একজন যৌনকর্মী মুনিরার (৩০, ছদনাম) সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভারতে পাচার হওয়াদের মধ্যে নারী ও মেয়ে শিশু বেশি। ভারতের ওইসব যৌন পলস্নী পরিদর্শন করে দেখা গেছে, সেগুলোতে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন স্থানের মেয়েরা রয়েছে। পর্যটন স্থান হওয়ায় এসব জায়গায় বিভিন্ন দেশের অঞ্চলের মানুষ আসে। অনেক সময় খদ্দেরের দেয়া বাড়তি টাকার লোভে অনিরাপদ যৌন কাজে লিপ্ত হন তারা।
সুফিয়া জানান, সাতক্ষীরা থেকে পাচার হওয়া অনেক মেয়ে রয়েছে যারা এখন নিজেরাই সেখানে ব্যবসা করছেন। বোম্বের যৌন পলীস্নগুলোতে বেশ কিছু এনজিও সাপোর্ট দেয় উলেস্নখ করে তিনি বলেন, ‘‘তবে এইচআইভি পজিটিভ সংক্রমণ হয়েছে জানতে পারলে, যৌন পলস্নীর লিডাররা এড়িয়ে চলেন। বের করে দিতে চান। এর ফলে মানবেতর জীবন যাপন করেন অনেকে।’’ পরে বাংলাদেশের অনেক মেয়েই আবার পালিয়ে এ দেশে ফিরে আসেন। সাতক্ষীরার স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা অগ্রগতি সংস্থার প্রাগ্রাম কো-অর্ডিনেটর অসীত ব্যানার্জি বলেন, ‘‘সাতক্ষীরা থেকে যেসব নারী পাচার হচ্ছেন তাদের বেশিরভাগই যাচ্ছেন বোম্বে অথবা পুনে’তে।’’ তিনি বলেন, ‘‘ভারতে যৌন পেশায় কর্মরত নারীদের মাধ্যমে এইচআইবি’র সংক্রমণ হচ্ছে এখানে। এছাড়াও ভারত থেকেও দালালরা ছদবেশে এখানে প্রবেশ করছেন, তারাও এইডসের বাহক হতে পারেন।’’ ভাইরাস-বিশেষজ্ঞ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘‘বিদেশ যাওয়ার আগে প্রত্যেককে সংক্রামক রোগ সম্পর্কিত, বিশেষত এইডসের ব্যাপারে ধারণা দেওয়া উচিত।’’ তিনি বলেন, ‘‘দেশে অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে এইচআইভি পজিটিভ নিয়ে। এরা সঠিকভাবে কাজ করছে কি-না তার মনিটরিং করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
উলেস্নখ্য, ২০১১ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে এইচআইভি এইডস আক্রামত্ম রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ১০১ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ৩২৫ জন। নতুন করে আক্রামত্ম রোগীর সংখ্যা ৪৪৫ জন। এর মধ্যে এইডস আক্রামত্ম ২৫১ জন। আর এতে মারা গেছেন ৮৪ জন। এছাড়া দেশে এইচআইভি আক্রামত্ম রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ৫’শ জন।
সুত্র: বাংলানিউজ

শেয়ার করুন